আজকের প্রার্থনা, সঠিকভাবে যেন ভোটটা দিতে পারি আজকের প্রার্থনা, সঠিকভাবে যেন ভোটটা দিতে পারি – CTG Journal

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
গণমাধ্যমের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা প্যাকেজ দাবি এডিটর্স গিল্ডের খালেদা জিয়ার বাসার সামনে পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন দুযোর্গ এড়াতে ‘করোনা’ মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করলেন লক্ষ্মীছড়ি ইউএনও ‘করোনা’ মোকাবিলায় দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্মীছড়িতে চলছে তৃতীয় দিনের কার্যক্রম ইতালিতে আক্রান্ত ৬ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী, মৃত ৫১ চিকিৎসক ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ করোনা নিয়ে গুজব ছড়ালে ব্যবস্থা: আইজিপি সারাদেশে মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ থাকবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত আবুতোরাবে ছাত্রলীগ-যুবলীগের উদ্যোগে ছিটানো হলো জীবানুনাশক পানি কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংক ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে পরিস্কার পরিছন্নতা অভিযান করোনা টেস্ট করিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাসায় কোয়ারেন্টিন থাকার নিয়মাবলী
আজকের প্রার্থনা, সঠিকভাবে যেন ভোটটা দিতে পারি

আজকের প্রার্থনা, সঠিকভাবে যেন ভোটটা দিতে পারি

মোফাজ্জল করিম- আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি, ২০২০, শনিবার। অনেক পোড়-খাওয়া এই জাতির আরেকটি বড় রকমের প্রত্যাশার দিন। আজ রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই দেশের সবচেয়ে বড় নির্বাচন। গত বেশ কিছুদিন ধরে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, অবাধ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতির ভাগ্যে জোটেনি। এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ-অনুযোগ, আলোচনা-সমালোচনা, কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে কিন্তু তাতে করে বুড়িগঙ্গার ঘোলা জল আরো ঘোলা হয়েছে, হয়েছে আরো কালো থিকথিকে, কাজের কাজ কিছু হয়নি। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ফোঁস-ফাঁস, তর্জন-গর্জন, হেন করেঙ্গা-তেন করেঙ্গার পর দেখা গেছে আসলে তারা বাবুরাম সাপুড়ের ‘চোখ নেই শিং নেই নোখ নেই’ মার্কা সাপ অথবা জ্ঞানপাপী। (সম্ভবত শেষেরটাই)। কেউ কেউ আবার মনে করেন, ‘আমার যখন দু’কানই কাটা তখন খামোখা রাস্তার একপাশ দিয়ে চলব কেন, মাঝখান দিয়েই চলি। তা ছাড়া কানে তুলো তো দিয়েই রেখেছি, পিঠেও বেঁধেছি কুলো। তা হলে আর ভয় কী।’ নোয়াখালীর চর অঞ্চলে আগের জামানায় ফুটবল খেলার আগে নাকি কোথাও কোথাও খেলোয়াড়দের আয়োজকরা বলেই দিতেন : ‘ঠেলি খেলো, ফাউল নাই।’ আমাদের নির্বাচনগুলোতে কি মহলবিশেষ এমন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তাদের ‘খেলোয়াড়দের’? জানি না কী আছে কপালে।

তবু জাতি আশায় বুক বেঁধে আছে একটা ভালো নির্বাচন দেখবে বলে। হাজার হোক আজ ফেব্রুয়ারির পহেলা তারিখ। এই সেই মাস যে মাসের একুশ তারিখে আমরা বুকের রক্ত দিয়ে একদা আমাদের মাতৃভাষাকে এক চিরভাস্বর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আজ আবার এসেছে ফেব্রুয়ারি। মাসের প্রথম দিনেই জাতি এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। সেটি রাজধানীর দুই করপোরেশনের নির্বাচন। জাতির আশা, একটি কলুষমুক্ত সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের গণতন্ত্রের অভিযাত্রার এক নতুন মাইলফলক স্থাপিত হবে আজ। আজকের নিবন্ধের শুরুতেই তাই সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট আকুল আবেদন : অনেক হয়েছে, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, দোষাদোষি, ঘুসাঘুসি, তালাতালি, গালাগালি অনেক হয়েছে, আর না, এবার দয়া করে ক্ষমা দিন। দলের দিকে নয়, মার্কার দিকে নয়, একটিবার সত্যের দিকে, ন্যায়ের দিকে, সর্বোপরি আপনার-আমার সকলের প্রাণপ্রিয় লাল-সবুজ পতাকার দিকে তাকান। কী দেখছেন? আপনার আমার অপকীর্তির কারণে এই পতাকা কি আজ পত পত করে উড়তে ভুলে যায়নি? লজ্জায়-দুঃখে সে কি বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে না? অর্ধ শতাব্দী হতে চলল স্বাধীন হয়েছি, জাতি আজ উন্নয়নের মহাসড়কে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে—একথা এখন আর স্লোগান দিয়ে বলতে হয় না–কিন্তু আফসোস, যে গণতন্ত্র ও সাম্য-ন্যায়নীতির জন্য অগণিত শহীদ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিল অকাতরে, তা আজো দূর আকাশের তারা হয়েই রইল আমাদের কাছে। আমরা নয় মাসের যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন করেছি, এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য পরম শ্লাঘার ব্যাপার, কিন্তু যে গণতন্ত্রের জন্য আমরা অস্ত্র ধরেছিলাম সেই গণতন্ত্রের সোনার হরিণ কি চিরকাল অধরাই থেকে যাবে আমাদের কাছে? আর এটা তো ঠিক, গণতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র কাঠামোকে স্থাপিত না করতে পারলে অচিরেই আমাদের সব অর্জন তাসের ঘরের মতো উবে যাবে। তা হলে আর কতদিন আমরা পথ চেয়ে বসে থাকব সেই গণতন্ত্র নামের সোনার হরিণের?

২.

গত শতাব্দীর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সত্তর ও আশির দশক পার হয়ে আমরা ইতিমধ্যে আরো তিন তিনটি দশক পার হতে চলেছি, আশা ছিল এতদিনে আমাদের গণতন্ত্রবৃক্ষ পত্রপুষ্পে মঞ্জরিত হয়ে চারদিক আলোকিত-আমোদিত করবে, সেই লক্ষ্যে অর্ধ ডজন জাতীয় নির্বাচনসহ ছোটবড় অনেক নির্বাচনও করেছি আমরা, কিন্তু আমাদের গণতন্ত্র যেন এক রুদ্ধবিকাশ বামনশিশু, যার প্রবৃদ্ধি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। লোকে যদি বলে, তোমরা এক দানবীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধ করে নয় মাসে দেশ স্বাধীন করতে পারলে, আর এতদিনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে দেশকে গণতন্ত্রের মজবুত ভিতে স্থাপন করতে পারলে না, এটা কেমন কথা? তা হলে আমরা কী জবাব দেব? আমাদের ললাট লিখনে কি শুধু এক মায়াবিনী কুহকিনীর জাদুমন্ত্রে বোতলবন্দি গণতন্ত্র, জ্বালাও-পোড়াও, ধরো-মারো ও নৈশভোজের, খুড়ি নৈশভোটের নির্বাচন? কেন, কী কারণে আমাদের নির্বাচন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কেন পুষ্টিহীনতাজনিত নানা রোগে ভুগে ভুগে শিশু গণতন্ত্রকে বারবার ‘লাইফ সাপোর্টে’ যেতে হয়, তা কি একবারও আমরা দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে, জাতীয় স্বার্থে, কেবলই জাতীয় স্বার্থে, বিবেচনা করে দেখব না? আজ যদি খোদা-না-খাস্তা, বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় এ দেশ, যদি যুদ্ধ বাধে, তখনো কি আমরা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের রাজনীতি ও শত্রুকে ঘায়েল না করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জব্দ করার আত্মঘাতী খেলায় মেতে থাকব? নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যের পথে না গিয়ে দিবারাত্রি কেবল ‘পারি অরি মারি যে কৌশলে’ নীতি আঁকড়ে ধরে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ না করে, বিভাজিত করতে থাকলে, সেটা যে হবে এক মারাত্মক আত্মঘাতী কৌশল, সেই বোধোদয়টা কবে হবে আমাদের? নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায় কিন্তু নির্বাচনের কাঙ্ক্ষিত ফলটা আমরা লাভ করি না।

যদি প্রশ্ন করি, তা হলে কি সংশ্লিষ্ট সকলের সদিচ্ছার অভাব? ছলে-বলে-কৌশলে, ‘বাই মিনস্ ফেয়ার আর ফাউল,’ ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করা, ক্ষমতা চিরস্থায়ী করাই কি মুখ্য উদ্দেশ্য? আর সবই গৌণ? না, অতটুকু ‘সিনিক্যাল’ (নৈরাশ্যবাদী) আমি হতে চাই না। তবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথাবার্তা ও কাজকর্মে কেমন জানি সন্দেহ হয় তাঁরা পহেলা ফেব্রুয়ারি দিনটা ভালোয়—মন্দয় কোনোমতে পার করে দিতে পারলেই বাঁচেন। দিনশেষে বলার জন্য তাঁরা ‘দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতীত নগরের সর্বত্র খুব সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন হয়েছে’ জাতীয় বক্তব্যের খসড়া বোধ হয় রেডি করে রেখেছেন। একটা তৃপ্তির ঢেকুরেরও অগ্রিম অর্ডার পাকস্থলীতে দিয়ে দিয়েছেন। নায়কের ভূমিকায় আছেন যে নির্বাচন কমিশন তাদের চালচলন দেখে আমাদের ছাত্রজীবনের একটা প্রবচন প্রায়ই মনে পড়ে। তখন ‘স্টেজে মেরে দেবো’ বলে একটা কথা খুব চাউর ছিল। কথাটা এসেছিল আমাদের সময়ের কিছু কিছু বন্ধু-বান্ধব যারা মঞ্চে অভিনয় করতে খুবই উৎসাহী ছিল অথচ রিহার্সেলে আসতে চাইত না, তাদের একটা প্রায়শ উচ্চারিত উক্তি থেকে। রিহার্সেলে আসে না কেন জানতে চাইলে তারা বলত, ‘আরে দূর, রিহার্সেল আবার লাগে নাকি। দেখবি স্টেজে ঠিকই মেরে দেবো।’ বলা বাহুল্য, স্টেজে মারতে গিয়ে বেশির ভাগ সময় তাদের লেজে গোবরে অবস্থা হতো।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার শুরুতে বললেন, সব দল রাজি না হলে নির্বাচনে ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু বিএনপিসহ ১২টি রাজনৈতিক দল ‘ভেটো’ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি বাজেট বরাদ্দ নেই, তবুও তড়িঘড়ি করে সরকারের ৪,০০০ কোটি টাকা খরচ করে ইভিএম আমদানি করলেন। এত বড় ক্রয়ের ব্যাপারে স্বচ্ছতা যে মোটেই ছিল না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সরকারই বা এটা অনুমোদন করল কিভাবে। এতে যদি বিরোধী দলগুলো বলে ‘দাল মে কুচ কালা হায়’ তা হলে সিইসি কী জবাব দেবেন? তিনি এবং তাঁর শক্তিশালী সিপাহসালার নির্বাচন কমিশনের সচিব শুধু ইভিএম-এর গুণকীর্তন করেই চলেছেন : এটা মেশিন, এটা কোনো ভুল করতে পারে না। ঠিক। তবে আমরা চিরকাল শুনে এসেছি বন্দুকের চেয়ে বন্দুক যে চালায় সেই মানুষটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেই কারণেই বিএনপি বলছে, বোতাম টিপলাম ধানের শীষে ভোট দেব বলে কিন্তু ভোট উঠল নৌকার খাতায়, সেটার কী হবে? অর্থাৎ আমি যে প্রার্থীকে ভোট দিলাম তাঁর মার্কায়ই যে ভোটটি পড়েছে তার নিশ্চয়তা কী? এর প্রতিবিধান ছিল ভিভিপিএটি (ভোটার ভেরিফাইয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল) সিস্টেমে, যেখানে ভোটার বোতাম টেপার পর এক টুকরো প্রিন্ট আউট পাবেন যাতে উল্লেখ থাকবে তিনি কোন মার্কায় ভোট দিয়েছেন। প্রতিবেশী ভারত গত ৮-৯ বছর যাবৎ এই পদ্ধতি চালু রেখে ইভিএমে ভোট নেয়। অবশ্য আমাদের চেয়ে ‘কম সৎ, কম বুদ্ধিমান’ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কেউই ইভিএমে ভোট নেয় না। তারা বোধ হয় এই প্রযুক্তির যুগে আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে! আরেকটি কথা। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটারদের প্রশিক্ষিত করতে নির্বাচন কমিশনের নেওয়া পদক্ষেপ এককথায় অপ্রতুল। কমিশন হয়তো ভাবছে এ ব্যাপারেও তারা স্টেজে মেরে দেবে।

তবে হ্যাঁ, ভোটের পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, ভোটকেন্দ্রে ‘গজারি পদ্ধতি’ চালু হয়ে গেলে কিছুই করার থাকবে না। তখন যথা পূর্বং তথা পরং। গজারি পদ্ধতি কী তাই তো বলা হলো না। এক দিঘিতে ছিল এক কচ্ছপ আর তার বন্ধু গজার। কচ্ছপ খুব বুদ্ধিমান বলে নিজেকে দাবি করে। যেকোনো কাজ সে খুব ভেবেচিন্তে করে। আর গজার বোকাসোকা গোয়ারগোবিন্দ টাইপের মানুষ। একদিন তারা খবর পেল, কাল সকালে জেলেরা দিঘিতে জাল ফেলবে। শুনে মহা চিন্তায় পড়ল গজার। সে বলল, কচ্ছপ ভাই, কী করা যায় বল তো? কচ্ছপ জবাব দিল, এটা কোনো ব্যাপারই না। আমার এক শ একটা বুদ্ধি আছে জাল থেকে বের হবার। তার যেকোনো একটা বুদ্ধি খাটিয়ে কেটে পড়ব। তুমি তো আবার লাফালাফি ছাড়া কিছুই পার না। হা-হা-হা। তোমাকে কী বুদ্ধি দেব বুঝতে পারছি না। পরদিন যখন জালে আটকা পড়ল দুজন তখন কচ্ছপ বুদ্ধি আঁটতে লাগল—কী করবে। ভাবতে ভাবতে সে ধরা পড়ে গেল জেলেদের হাতে। আর গজার তার একমাত্র বিদ্যা প্রয়োগ করে মার কৈলাস বলে দিল এক লাফ, আর অমনি জাল ছিঁড়ে সে উড়াল দিয়ে গিয়ে পড়ল নিরাপদ পানিতে। ভোটের ব্যাপারে ‘গজারি বুদ্ধি’ হচ্ছে ইভিএম-টিভিএম সব কিছুকে কলা দেখিয়ে সোজা কেন্দ্র দখল করা। তারপর সিল মারো ভাই সিল মারো। অন্যরা যখন মেশিন নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় ব্যস্ত, রিটার্নিং অফিসার-পোলিং অফিসারদের কিভাবে হাত করবে সেই ফন্দি-ফিকির বের করার ধান্দায় আছে, ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশের চোখ কী করে ফাঁকি দেবে সেই উপায় খুঁজছে, এরা তখন ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনে’ চলে যায়।

জানি আপনারা অনেকেই বলবেন, কেন্দ্র দখল করা, ইভিএম অকার্যকর করে ফেলা ও অন্যান্য অপকর্ম করা কি অত সোজা? আনসার-পুলিশ-বিজিবি-ম্যাজিস্ট্রেট আছে না? প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। আমার সারা জীবনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় নির্বাচনসহ অনেকগুলো নির্বাচনে—যার মধ্যে ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য—এসডিও, ডিসি, কমিশনার পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে বলব, প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে—সবচেয়ে বড় কথা, তাদের নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিলে—গজারি পদ্ধতি বলুন আর বাজারি পদ্ধতি বলুন, সবই ফেল মারতে বাধ্য। তবে ডিসি-এসপি-ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সকলকে, সেই সঙ্গে অন্য সকল নির্বাচনী কর্মকর্তাকে, দায়িত্ব পালন করতে হবে অকুতোভয়ে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে। গোপীবাগের সেদিনকার ঘটনার মতো নয়। মারামারি হলো দুই পক্ষে, আহতও বোধ হয় হয়েছে দুই দলেরই লোক, আর পুলিশ কিনা মামলা নিল এক পক্ষের। গ্রেপ্তার করল, রিমান্ডে নিল তাদের প্রতিপক্ষের লোকদের। অন্য পক্ষের মামলাটি পর্যন্ত নিল না। এটা কেমন নিরপেক্ষতা? ভোটের দিনও কি এ রকম এক যাত্রায় পৃথক ফল দেখা যাবে? তাহলে তো যে কেউই মনে করতে পারে যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়াবেন…ইত্যাদি।

৩.

আচ্ছা, ভালো কথা, নির্বাচন কমিশনের ভেতরে হচ্ছেটা কী? প্রায় রোজই আমরা পেপার-পত্রিকায় দেখি কমিশনের ভেতর অনৈক্যের সংবাদ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়ের নিশ্চয়ই খুবই দয়ার শরীর, তিনি আচরণবিধি লঙ্ঘনই হোক আর মারামারি, ধরাধরি যা-ই হোক না কেন, সবই মনে হয় ‘ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে’ দেখেন। তা না হলে তাঁর কাছে নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগের ডাঁই জমা হলেও তিনি কোনো ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নেন না কেন? আবার এসব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাঁর সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার জনাব মাহবুব তালুকদারকে পাত্তাই দিতে চান না কেন? কোনো বিষয়ে একজন অপরজনের সঙ্গে অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তাই বলে একজন কমিশনারকে কথাই বলতে দেওয়া হবে না এটা কেমন কথা। মনে হয় যেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব তালুকদারকে কমিশন থেকে ‘অমিশন,’ ‘এলিমিনেশন’ বা ‘ডিলিশন’ করতে চান। তা না হলে তাঁর লিখিত প্রস্তাবসমূহ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয় না কেন কমিশন সভায়। আবার কমিশনের সচিবের কথায়-বার্তায় মনে হয়, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানটির ‘বস্’। তিনি অবশ্যই জনসমক্ষে একজন কমিশনারের কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিতে পারেন না, যা তিনি তালুকদার সাহেবকে নিয়ে সম্প্রতি করেছেন। এগুলো আর যা-ই হোক, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির অফিস ডিসিপ্লিন, চেইন অব কমান্ড ইত্যাদি সম্বন্ধে ভালো ধারণা দেয় না। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, মাহবুব তালুকদার সাহেব ওই ‘ডার্টি লিনেন’ পাবলিকলি না ধুইলেও পারতেন। কিন্তু লিনেনটা যখন এত ময়লা হয়ে যায় যে তার থেকে রীতিমতো দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, তখন কী আর করা। মাহবুব সাহেব কর্তাভজা মেরুদণ্ডহীন নন বলে জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এমনটি করেছেন বলে আমি মনে করি। তবে পুরো ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক, এতে কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কী করে থাকে, বলুন।

আসলে তাঁরা কেউই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য চার কমিশনার মিলেই কমিশন। তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন সম্মিলিতভাবে, সিদ্ধান্ত নেবেন যৌথভাবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। তা কি হচ্ছে? নাকি কেবল ক’য়ে কমিশন নয়, ক’য়ে কোন্দলই হচ্ছে সেখানে।

৪.

তার পরও আজ নির্বাচন। বড় আশা করে আছি ভোটটা দেব উৎসবমুখর অথচ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তো সেই আশ্বাসই দিয়ে আসছেন আগাগোড়া। তাঁদের আশ্বাস আজ যেন হতশ্বাসে পরিণত না হয় সেই প্রার্থনাই করি। তবু কথায় আছে না, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।

ইলেকশন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অনেক নালিশের কথা শুনেছি। সরকারের কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এমন উক্তিও করেছেন, বিএনপি নাকি এখন নালিশের দল হয়ে গেছে। উঠতে-বসতে খালি নালিশ আর নালিশ। তা আপনারা যদি উঠতে-বসতে তাদের খালি কিল-ঘুসি মারতে থাকেন, তবে তারা কি মাগো-বাবাগো বলে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণও করতে পারবে না? কোথাও প্রতিকার না পেয়ে অন্য কারো কাছে নালিশও জানাতে পারবে না? নাকি আমার কৈশোরের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন নোয়াখালী জিলা স্কুলে এক সহপাঠীর মুখে যে শুনতাম, ‘এমন মাইর দিমু, একছার (একেবারে) গাবুইরা (জোয়ান মরদের) মাইর, মা কইতি হাইরবি (পারবি), গো কইতি হাইত্তিনো (পারবি না),’ সেটাই বোঝাতে চান? নালিশের মতো ঘটনা ঘটলে নালিশ তো হবেই। তারপর সালিশও হতে পারে। তা অমন ঘটনা কেউ না ঘটালেই হয়। অন্তত আজকের দিনটাতে।

শুভ নির্বাচন। অন্য কেউ জিতুক না জিতুক মেয়র পদে আজ জিতুক গণতন্ত্র। আর কাউন্সিলর পদে নির্বাচন। ঠিক আছে না?

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT