রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষা এবং নাগরিক স্বার্থ রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষা এবং নাগরিক স্বার্থ – CTG Journal

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
‘বঙ্গবন্ধু আবাসনে’ ঠাঁই হলো ৩৪ পরিবারের করোনা সংকটে উদ্বিগ্ন জার্মান মন্ত্রীর আত্মহত্যা করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর চার পরামর্শ করোনা প্রতিরোধে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে আ. লীগ দায়িত্ব হস্তান্তর ও যৌথসভায় ডিইউজে’র নেতৃবৃন্দ- গণমাধ্যম কর্মীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ভাতাসহ ৯ দফা দাবি গণমাধ্যমের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা প্যাকেজ দাবি এডিটর্স গিল্ডের খালেদা জিয়ার বাসার সামনে পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন দুযোর্গ এড়াতে ‘করোনা’ মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করলেন লক্ষ্মীছড়ি ইউএনও ‘করোনা’ মোকাবিলায় দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্মীছড়িতে চলছে তৃতীয় দিনের কার্যক্রম ইতালিতে আক্রান্ত ৬ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী, মৃত ৫১ চিকিৎসক ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ করোনা নিয়ে গুজব ছড়ালে ব্যবস্থা: আইজিপি
রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষা এবং নাগরিক স্বার্থ

রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষা এবং নাগরিক স্বার্থ

ফরিদুল আলম- অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার পুরো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আপত্তি উত্থাপিত হলেও তা হালে পানি পায়নি। প্রধান দুই দলের পক্ষ থেকে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও দুই সিটিতে তাদের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়টি নতুন না হলেও এবার দুই দলের পক্ষ থেকেই তাঁরা প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে। এ লক্ষ্যে মনোনয়নের শেষ সময় পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে মনোনয়ন পরিবর্তন করেও শেষ রক্ষা করা যায়নি। এবারের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ধরন দেখে মনে হচ্ছে তারা বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের বাইরে কাউন্সিলর পদের মনোনীত এবং বিদ্রোহী উভয় প্রার্থীরা বেশ সরগরম প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে তারা খুব একটা সন্তুষ্ট এবং এর ফলে তাদের এতটা উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করা এমনটা অবশ্য বলা যাবে না। সার্বিক বিবেচনায় যা বোঝা যাচ্ছে, তা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে এবারের সিটি নির্বাচনকে একটি পরীক্ষা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মূলত জনগণের কাছে যে বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাইছে তা হচ্ছে তারা নির্বাচন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং আপাতত এই বিষয়কে সামনে নিয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে ভোটের পর চাঙ্গা হতে চেষ্টা করবে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে।

তাত্ত্বিকভাবে নগরে বসবাসরত নাগরিকদের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো দেশের চারটি (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী) সিটি করপোরেশনে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলেও আজ এর ২৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমরা যদি নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাব যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের আগে প্রদেয় তাঁদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাগরিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের পক্ষ থেকে তাঁদের ওপর অর্পিত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা বললেও করপোরেশনের এখতিয়ারের ভেতর থেকেও যতটুকু নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করা সম্ভব, সেটিও লক্ষণীয় হয়নি। এ ক্ষেত্রে সততা, আন্তরিকতা এবং কাজ করার ইচ্ছা থাকলেই যে নাগরিকদের সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক।

এবারের নির্বাচনটিও আমাদের সিটি করপোরেশনের আগামী দিনের উন্নয়নের জন্য একটি মডেল হতে পারে এ জন্যই যে প্রধান দুই দল থেকেই এবার মেয়র পদে অপেক্ষাকৃত তরুণদের বাছাই করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে কারো কারো ভূমিকা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে বলে জানা যায়। তবে শঙ্কার জায়গাটি হচ্ছে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামিল এমন অনেক প্রার্থী রয়েছেন, যাঁরা নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দ্বারা এরই মধ্যে আলোচিত এবং সমালোচিত। নির্বাচিত মেয়রদের আন্তরিকতার পাশাপাশি কাউন্সিলরদের সহযোগিতা না থাকলে উন্নয়ন দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। একজন কাউন্সিলরই ভালোভাবে জানেন তাঁর সীমানার ভেতরের সমস্যাগুলো এবং যথাযথ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয়তার বিকল্প নেই। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে চরিত্র ধারণ করেছে, এই পরিস্থিতিতে মেয়রদের শুধু যোগ্যতাসম্পন্ন হলেই চলবে না, সেই সঙ্গে কাউন্সিলরদেরও এলাকার উন্নয়নে এবং সেই সঙ্গে প্রচলিত ধাঁচের উন্নয়ন ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে অভিনবত্বের পথে অগ্রসর হতে হবে। নগরবাসী সিটি করপোরেশন থেকে যে ধরনের সেবা প্রত্যাশা করে, আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিভিন্ন এলাকায় সোসাইটি গঠনের মাধ্যমে নিজেরাই এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।

পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে আজকের উন্নয়নের নেপথ্যে বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সরকারের বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে রেখে এক ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করানো হয়। ফলে উন্নয়ন যেমন দৃশ্যমান হয়, জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থেরও সদ্ব্যবহার সম্ভব হয়। বর্তমান বিদ্যমান বাস্তবতায় শুধু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আন্তরিকতার মাধ্যমে নাগরিক জীবনের নানা রকম সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের কাজের পরিধিকে আরো সম্প্রসারিত করা এবং তাঁদের সীমানার ভেতর নিত্য নাগরিক সমস্যাগুলো কিভাবে সহজে সমাধান করা সম্ভব হয় সে জন্য কাজের সুযোগ করে দেওয়া। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এভাবে জনগণের অর্থের যথেচ্ছ অপচয় কার্যত দীর্ঘ মেয়াদে সরকারকেই জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করে তোলে।

আমরা জানি, ঢাকা মহানগরী বর্তমানে নানা নেতিবাচক কারণে বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্যাপক জনসংখ্যা,  বায়ু ও শব্দদূষণ, যানজট, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাটসহ আরো অনেক কিছু। একটি দেশের রাজধানী যেখানে পুরো দেশকে চিত্রিত করে, সেখানে আমাদের দেশের অনেক দৃষ্টিনন্দন জায়গা থাকতেও কোনো বিদেশি এই শহরে নেমেই হোঁচট খায় এবং আমাদের দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণ নিয়েই ফিরে যায়। এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমান সরকার দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে রাজধানীর উন্নয়নেও নানা রকম পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে; কিন্তু যে কথা এর আগে উচ্চারণ করেছি—সমন্বয়হীনতা, এর জন্যই উন্নয়ন সেভাবে আলোর মুখ দেখছে না। আমাদের সবার কাছে নগরের নির্বাচিত মেয়রদ্বয় নগরপিতা হিসেবে পরিচিতি পান; কিন্তু এই পিতারা তাঁদের সন্তানতুল্য নগরের উন্নয়নের জন্য যদি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কাজ করতে যান, তাহলে তাঁদের অসহায় পিতা বলতে হয়।

প্রার্থীরা নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। তাঁদের প্রতিজ্ঞার ২৫ শতাংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলেও বলব আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন একটি সুন্দর নগর এবং নাগরিক পরিবেশ উপহার দিতে। এই সিটি নির্বাচন নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির প্রচার-প্রচারণার তোড়জোড় দেখে মনে হয়েছে যে সব কিছু ছাপিয়ে এটি প্রধান দুই প্রতিপক্ষের কাছে একটি শক্তি ও মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিশ্চয় তাঁদের প্রতিজ্ঞা ভুলে যাবেন না। শুধু আজকের নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ঢাকা গড়তে না পারলে তাঁদের কাছ থেকে আমরা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারি না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT