রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা – CTG Journal

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
মানিকগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন ৪ খুনের রহস্য উন্মোচন: খোটা দেওয়ায় পরিবারসহ ভাইকে খুন প্রধানমন্ত্রী যা আহ্বান করেন জনগণ তাতেই সাড়া দেয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরগুনায় সৌদি প্রবাসীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা: পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ সাংবাদিক নেতা রুহুল আমীন গাজী গ্রেফতার মানিকছড়িতে প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তার বিদায় অনষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি হচ্ছে গরুর নাড়িভুড়ি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা ফরম পূরণের কিছু টাকা ফেরত পাবে এইচএসসি শিক্ষার্থীরা মহাবিশ্বের নক্ষত্রের চেয়েও বেশি ভাইরাস পৃথিবীতে, কিন্তু সব ভাইরাস দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয় না কেন? কারিগরি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতেই হবে
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা

♦ আবুল কাসেম ফজলুল হক-

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা কি উন্নতিশীল অবস্থায় আছে? যে ধারায় চলছে তাতে আর ১০ বছর, ২০ বছর, ৫০ বছর, ১০০ বছর পর বাংলাদেশের ও বাংলা ভাষার অবস্থা কী হবে? কিছু লোক বলে থাকেন, এখন বিশ্বায়নের যুগ, এখন রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রভাষার দিন শেষ। তাঁরা Global state, global citigen, liberalism, pluralism, capitalism, depoliticigation (anarchism), civil society (NGO)  ইত্যাদির কথা খুব বলেন। জি-সেভেন (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান—এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ), ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বায়ন নামে পরিচিত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা। বিশ্বায়নের কালে সমাজতন্ত্র সম্পূর্ণ বিলীয়মান, গণতন্ত্র বিকারপ্রাপ্ত ও গণবিরোধী রূপ নিয়েছে, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিশ্বায়নের উদ্ভব উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের ধারা ধরে নতুন প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, মানবজাতি দারুণ আদর্শগত শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেছে। এ অবস্থায় দুনিয়াব্যাপী ধর্মের ও পুরনো সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। মূলত আদর্শগত শূন্যতা, আদর্শের নামে আদর্শহীন কার্যকলাপ, দুর্নীতি, অনাচার, জুলুম-জবরদস্তি, যুদ্ধ ও গণহত্যা দ্বারা ধর্মের এই পুনরুজ্জীবনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে ধর্মের এই পুনরুজ্জীবনের পেছনে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে পরাজিত অবস্থায় রাখার উদ্দেশ্যে, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে তারা ধর্মের ও পুরনো সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজ করছিল। তাদের কার্যকলাপের ফলেই একপর্যায়ে জঙ্গিবাদও (Armed Islamic fundam endalism) দেখা দেয়। তাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের সহযোগীরা জঙ্গিবাদীদের দমনের জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং যুদ্ধ ও কঠোর দমননীতি চালাতে থাকে। যেসব রাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আগ্রাসী যুদ্ধ ও গণহত্যাকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছে, জঙ্গিবাদীরা সেসব রাষ্ট্রেই তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভিযান যদি সম্পূর্ণ সফল হয় তাহলে চলমান বিশ্বায়ন নিয়ে মানবজাতি কি কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল অবস্থায় উত্তীর্ণ হবে? বিশ্বায়নবাদীরা কি মানবজাতিকে সভ্যতা ও প্রগতির পথে চালাচ্ছে?

পাশ্চাত্য সভ্যতার সংকট নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে অসওয়ার্ল্ড স্পেংলার, আলবার্ট সুয়েটজার, সিগমান্ড ফ্রয়েড, বার্ট্রান্ড রাসেল, এরিখ ফ্রোম প্রমুখ মনীষীর চিন্তাধারা ও ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে অবশ্যই সিদ্ধান্ত দাঁড়াবে যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের সহযোগীদের অভিযানের দ্বারা জঙ্গিবাদকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হলেও মানবজাতির জন্য কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল অবস্থা সৃষ্টি হবে না। এ অবস্থায় বিশ্বায়নের অন্ধ অনুসারী হয়ে বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় সত্তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে শুধু বিশ্বমান অর্জনের চেষ্টা করে কি ঠিক কাজ করছে? মৃত্যুর ঠিক আগে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমা সভ্যতার সংকট সম্পর্কে যে উপলব্ধি ব্যক্ত করেছিলেন, তা পূর্বোক্ত মনীষীদের উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় দেখা দিয়েছিল। পূর্বোক্ত মনীষীরা সভ্যতার সংকট থেকে উদ্ধার লাভের জন্য নতুন রেনেসাঁসের প্রয়োজন ব্যক্ত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি আস্থা হারিয়ে নতুন সভ্যতার, সেই সঙ্গে নতুন মহামানবের আত্মপ্রকাশ আশা করেছিলেন পশ্চিম থেকে নয়, পূর্ব থেকে। সভ্যতার সংকট ও নতুন সভ্যতার উদ্ভব সম্পর্কে আরো অনেক কথা তাঁরা বলেছিলেন, যেগুলো বর্তমান বাস্তবতায় নবমূল্যায়নের দাবি রাখে। সভ্যতার ধারণা হারিয়ে গেছে দেখে ক্লাইভ বেল সিভিলাইজেশন নামে বই লিখেছিলেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী সেটি অবলম্বন করে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য রচনা করেছিলেন ‘সভ্যতা’। এ বইটিও বর্তমান বর্বরতামুখী উন্নয়নের কালে সবার মনোযোগ দাবি করে। সভ্যতার ধারায় সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান-পতনের ইতিহাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা দাবি করে। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠন দরকার। দুনিয়াব্যাপী মানুষ আজ যেভাবে পরিবর্তনবিমুখ হয়ে আছে, তেমন থাকবে না, পরিবর্তন উন্মুখ হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে—মানুষে পরিবর্তন করত। জাতি, জাতীয় সংস্কৃতি, রাষ্ট্রভাষা বিকাশমান থাকবে—বিলুপ্ত হবে না। যারা নিজেদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সত্তাকে বিকাশমান রেখে চলবে না, তারা মানবজাতির মূলধারায় টিকতে পারবে না।

এ অবস্থায় এখন বাংলাদেশের ভূভাগে জাতি ও রাষ্ট্র বিষয়ে উদাসীন থাকাও বিশ্বায়নে বিলীন হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর দূতাবাসমুখী রাজনীতি, দল দুটির ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কমুখী রাজনীতি ইত্যাদি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির ও বাংলাদেশের বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সম্পূর্ণ প্রতিকূল। উত্তরাধিকারভিত্তিক, পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পূর্ণ গণতন্ত্রবিরোধী, গণস্বার্থবিরোধী—এ দিয়ে বাংলাদেশে কস্মিনকালেও স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবে না। বাংলা ভাষার উন্নতির প্রতি ও রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে সম্পূর্ণরূপে চালু করার প্রতি উদাসীন থেকে বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার প্রতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে মূলধারার ব্যবস্থাকে দ্বিখণ্ডিত করে ইংলিশ ভার্সন চালু করা ও ইংরেজি ভাষার প্রতি কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া ইত্যাদি শুধু বাংলা ভাষার বিকাশকেই ব্যাহত করা হচ্ছে না—বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির গড়ে ওঠার পথেও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইংরেজি শেখার ও ইংরেজিতে শেখার সুব্যবস্থা বাংলাদেশে দরকার। তা না হলে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারবে না। তবে বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীন থেকে বাংলা ভাষাকে যথোচিত গুরুত্ব না দিয়ে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে যাওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের পরিপন্থী। বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, বিচারব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চপর্যায় ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রায় সবাই তাদের ছেলে-মেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলছে।

এসব ঘটনা অবশ্যই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের পরিপন্থী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের পরিপন্থী কার্যকলাপ যেখানে বেড়ে চলছে, সেখানে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার যথার্থ প্রতিষ্ঠা, আমার মনে হয়, সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তাভাবনা দরকার।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রভূত উন্নতি হয়েছে এবং রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠাও অনেকখানি হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরিচালনায় যে নির্বাচনব্যবস্থা (জাতীয় সংসদ), সরকার গঠনের নতুন ব্যবস্থা বাংলাদেশে চলছে, তাতে সরকারের ও শাসকশ্রেণির বাংলা ভাষার প্রতি সে আগ্রহ আর নেই। রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাংলা চলছে বটে, তবে প্রবণতা ইংরেজিতে চলে যাওয়ার দিকেও বিকশিত হচ্ছে। বিচারব্যবস্থায় বাংলা চালু করার কোনো ধারাবাহিক সরকারি উদ্যোগ আর নেই। ব্যাংকে বাংলা চালুর কোনো চেষ্টাও নেই। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাব্যবস্থা ছেড়ে ইংরেজির দিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে চলছে। জনমত বাংলার পক্ষে, তবে কোনো কিছু নিয়েই গভীর বিচার-বিবেচনা নেই, কোনো বৌদ্ধিক আন্দোলন নেই। সাহিত্যের বই অনেক বের হচ্ছে, কবিদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে। গল্প-উপন্যাস অনেক লেখা হচ্ছে। কিন্তু সাহিত্যে প্রাণশক্তির পরিচয় আশাপ্রদ নয়। জনপ্রিয় বইয়ের বাজার খুব ভালো। কিন্তু যথার্থ সাহিত্য প্রথায় যথোচিত মর্যাদা পাচ্ছে না। পুরস্কারের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয় সম্পর্কে শিক্ষিতসমাজে ঔদাসীন্যই মূল প্রবণতা। বাংলা একাডেমির বইমেলায় ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় চার হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। মূল্য বিচার নেই, সমালোচনা নেই, সমালোচক নেই। ভালো-মন্দের বিচার নেই।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিতসমাজের ভেতর থেকে বাস্তবসম্মত নতুন চিন্তাভাবনা দরকার।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চিন্তাবিদ

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT