মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না – CTG Journal

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৫:২২ অপরাহ্ন

        English
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না

♦ প্রভাষ আমিন

’৭২ সালের পর এবারের এসএসসি পরীক্ষা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় সরকার ব্যাপক ছাড় দিয়েছিল। তাই ‘বাহাত্তরে ম্যাট্রিক’ শিক্ষাব্যবস্থায় গালি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষা শতভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড হয়েছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদেরও ‘আঠারোর গেরো’ পেরুতে অনেক সময় লাগবে।

২০১২ সাল থেকেই বাংলাদেশে প্রশ্ন ফাঁস চলে আসছে। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা তো বটেই; ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এসেছে। তবে এবার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে অবাধে। সরকার শুরুতে অস্বীকার, তারপর অল্প-স্বল্প স্বীকার, তারপর পাল্টাপাল্টি দায় চাপানো, সবশেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা। সংসদে, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে, পত্রিকায়, টক শোতে এবং সত্যিকার অর্থে ঘরে ঘরে এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ।

শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারে এখন প্রতি ঘরেই কোনও না কোনও পরীক্ষার্থী থাকে। আর একজন পরীক্ষার্থী থাকলে তাকে ঘিরে অভিভাবক, স্বজনদের উদ্বেগ থাকে। প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন স্বীকার করছে, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় তা ঠেকানো সম্ভব নয়। তারা প্রকৃতপক্ষে হাল ছেড়ে দিয়েছে এবং প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে।

আর সব বিষয়ের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়েও আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রীর দিকে। কিন্তু গত ২০ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরো বিষয়টিকে যেভাবে হালকাচালে উড়িয়ে দিতে চাইলেন, তা আমাদের হতাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন— ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়। এটা যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। কখনও প্রচার হয়, কখনও হয় না’— তখন ফাঁসকারী চক্র উৎসাহিত হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন; যাক— প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন যে এটা যুগ যুগ ধরে হয়ে হয়ে আসছে, তার মানে এটা আর সিরিয়াস বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘মন্ত্রী-সচিব তো কেন্দ্রে গিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করেন না’, তখন মন্ত্রী-সচিব এক ধরনের দায়মুক্তি পেয়ে যান।

তাহলে এই যে বছরের পর বছর প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, এর দায় কার, ব্যর্থতা কার? প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে, ওনারা শাস্তি দেবেন। সাংবাদিকদের তাহলে সাংবাদিকতা ছেড়ে গোয়েন্দাগিরি করতে হবে। আর গোয়েন্দারা তাহলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাক।

প্রধানমন্ত্রীর সেই সংবাদ সম্মেলনে প্রয়োজনে এমসিকিউ তুলে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন আকাঙ্ক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আদেশের মতো। বেশ কয়েকদিন ধরেই এমসিকিউ তুলে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী এমসিকিউ তুলে দেওয়ার কথা বলার পরদিনই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা এবং বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথম সিদ্ধান্ত হলো, আগামী বছর থেকে এসএসসি পরীক্ষায় এমসিকিউ থাকবে না।

এমসিকিউর আলোচনায় পরে আসছি। সে বৈঠকে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে বেশকিছু বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তাই শিক্ষা সচিব বিস্তারিত জানাননি। তবে একটা ব্যাপার তিনি নিশ্চিত করেছেন, আগামী বছর থেকে পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্ন পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। একটি বিকল্প হলো, আধঘণ্টা আগে পরীক্ষা কেন্দ্রের পাশে প্রশ্ন ছেপে পরীক্ষা নেওয়া। যশোর বোর্ডে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতির প্রয়োগও হয়েছে। স্বল্প পরিসরে প্রয়োগ করা এক কথা, আর সারাদেশে পরীক্ষার আধ ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ছেপে বিলি করা আরেক কথা।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্র ছিল তিন হাজার ৪১২টি। সব কেন্দ্র কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো শহরে নয়; প্রত্যন্ত গ্রামে আছে, দুর্গম পাহাড়ে আছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হাওর এলাকায় আছে। সব এলাকায় একই সময়ে প্রশ্ন ছাপানো সম্ভব কি না, আমি জানি না। সব এলাকায় কেন্দ্রের কাছে ছাপাখানা আছে কি না, পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে সব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকবে কি না— এসবের নিশ্চয়তা কে দেবে? মন্ত্রণালয়ে বসে ভাবা যত সহজ, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন।

সেদিনের বৈঠকে প্রশ্ন ফাঁস রোধে আরেকটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছর থেকে আর পরীক্ষায় আর প্রশ্ন ছাপা হবে না। ডিজিটাল প্রশ্নব্যাংকের মাধ্যমে অটোমেটিক প্রশ্নপত্র তৈরি করা হবে। আর পরীক্ষার্থীদের হাতে একটি করে ট্যাবের মতো ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়া হবে। পরীক্ষা শুরুর আগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্নের কোড জানিয়ে দেওয়া হবে। পরীক্ষা শুরুর সময়ে পরীক্ষার্থীদের ডিভাইসে অটোমেটিক প্রশ্ন ভেসে উঠবে। সেটা দেখেই তারা উত্তর লিখবে। শুনতে বেশ ভালো লাগছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে তো এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতাটা ভাবুন একবার। ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর জন্য ২০ লাখ ট্যাব কিনতে হবে। রীতিমতো হাজার কোটি টাকার মামলা।

আমার ধারণা, সবাই মিলে এই দ্বিতীয় বিকল্পের পেছনেই ছুটবে। কারণ এখানে অনেক টাকার ব্যাপার আছে। টাকা মানেই কমিশন, টাকা মানেই লাভ। প্রতিটি ছাত্রের হাতে ডিজিটাল প্রশ্ন তুলে দেওয়া মানেই অনেকের আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার সুযোগ। আর এটা কিন্তু এককালীন বিনিয়োগ নয়। প্রযুক্তি সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা বুঝবেন, প্রতিবছরই কিন্তু এক সেট করে, মানে ২০ লাখ ট্যাব কিনতে হবে। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি ধরলে এই হিসাব হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কারণ এক ট্যাব দিয়ে আপনি বছরের পর বছর কাজ চালাতে পারবেন না। এক পরীক্ষা থেকে আরেক পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে কে এই ট্যাবগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করবেন? ধরে নিচ্ছি, টাকা বা ট্যাবের কোনও অভাব নেই।

কিন্তু ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর সবাই তো প্রযুক্তিবান্ধব নাও হতে পারে। গ্রামের অনেকে তো হয়তো জীবনে ট্যাব দেখেইনি। আর ২০ লাখ ট্যাবের মধ্যে অল্পকিছুও যদি বিগড়ে যায়, সেই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার কী হবে?

এই দুই বিকল্পের কোনোটাই এখনও চূড়ান্ত হয়নি। নিশ্চয়ই পরীক্ষার আগে এ নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা হবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, আগামী বছরের এসএসসি থেকে পাবলিক পরীক্ষায় আর এমসিকিউ প্রশ্ন থাকছে না। এমসিকিউ না থাকলে আমার কোনও আপত্তি নেই। এমসিকিউ ধারণাটি এসেছিল দারুণ শুভ চিন্তা থেকে। শিক্ষার্থীরা পুরো বই পড়বে। যেখান থেকে ইচ্ছা প্রশ্ন করলে তারা সঠিক উত্তরটি খুঁজে নিতে পারবে। কিন্তু কোচিং সেন্টার আর গাইড বইওয়ালারা দ্রুত এমসিকিউয়ের প্রশ্ন ব্যাংক বানিয়ে বই ছেপে বাজার ভর্তি করে ফেলেছে। আর আমরা পেয়েছি এমসিকিউ প্রজন্ম। এরা সঠিক উত্তর জানে না, তিনটি অপশন থেকে বেছে নিতে পারে। এমন কৌতুকও আছে, এক ছাত্রের কাছে জানতে চাওয়া হলো, তোমার বাবার নাম কী? সে বললো, অত কিছু জানি না, আপনি তিনটা উত্তর দেন, আমি সঠিক উত্তরে টিক দিয়ে দিচ্ছি।

এই টিক চিহ্ন প্রজন্মের উত্থানে জিপিএ-৫-এর জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে দেশ।
গত বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল খুব খারাপ হয়েছিল, গড় পাশের হার ছিল ৮০ শতাংশ। তার আগের বছর ছিল ৮৮ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল এক লাখ ৪ হাজার, আগের বছর এ সংখ্যা ছিল এক লাখ ৯ হাজার। পাশের হার আর জিপিএ-৫-এর এই উল্লম্ফনে বড় অবদান এমসিকিউয়ের। এখন একশতে ৩০ নম্বর থাকে এমসিকিউ। অন্ধের মতো টিক দিলেও ২০ পাওয়া যায়।

আর কোনও কেন্দ্রে একজন সবগুলো ঠিকঠাক জানলে বাকিরাও কোনও না কোনোভাবে পেয়ে যায়। আর দয়ালু শিক্ষক থাকলে তো কথাই নেই, ৩০-এ ৩০’ই পাওয়া যায়। বাকি রচনামূলক অংশের ৭০ নম্বর থেকে ৫০ ম্যানেজ করতে পারলেই ৮০ হয়ে যায়। তাই এমসিকিউ না থাকলে আমার কোনও আপত্তি নেই। এমসিকিউ না থাকলেই বরং শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি পড়তে হবে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে গাইড বই ব্যবসায়ীদের। পড়ুক, তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আগামী বছর থেকেই এসএসসি পরীক্ষায় এমসিকিউ বাদ দেওয়ার প্রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার প্রবল আপত্তি আছে।

এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা মোট ২৫ মাস সময় পান। নবম ও দশম শ্রেণির দুই বছরে ২৪ মাস আর ১ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরুর আগে এক মাস। আগামী বছর যারা এসএসসি পরীক্ষা দেবে, তারা কিন্তু এরই মধ্যে ১৪ মাস পড়ে ফেলেছে। বাকি আছে আর ১১ মাস। তার মানে তারা অর্ধেকের বেশি সময় প্রস্তুতি নিয়েছে এমসিকিউ ধরে। এখন তাদের পরীক্ষা দিতে হবে এমসিকিউ ছাড়া। তার চেয়ে বড় কথা হলো— এমসিকিউ না থাকলে বাকি ৩০ নাম্বারের প্রশ্ন কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও কেউ জানে না। এখানে পরীক্ষার সময়েরও একটা ব্যাপার আছে। এতদিন এমসিকিউয়ের ৩০ নম্বরের জন্য সময় বরাদ্দ ছিল ৩০ মিনিট। আর বাকি ৭০ নম্বরের সৃজনশীলের জন্য বরাদ্দ ছিল আড়াই ঘণ্টা।

শিক্ষার্থীরা আড়াই ঘণ্টায় সাতটি সৃজনশীলের উত্তর দিতেই হিমশিম খেয়ে যেত। এখন এমসিকিউ না থাকলে বাকি ৩০ নম্বরের উত্তর দিতে তারা বাড়তি সময় কই পাবে? আগামী বছর থেকে এসএসসিতে এমসিকিউ না থাকলে অপ্রস্তুত পরীক্ষার্থীরা ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আমার শঙ্কা, পাসের হার নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। লাখ লাখ জিপিএ-৫ আর থাকবে না, নেমে আসবে হাজারের ঘরে, প্রথমবার শয়ের ঘরে নামলেও আমি অবাক হবো না।

গত কয়েকবছরে পরীক্ষা নিয়ে, প্রশ্ন নিয়ে এমনসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে যে আমার কাছে মনে হয় শিশুরা যেন গিনিপিগ। এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরাও জানে, আগের রাতে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তারা জানে, পাসের হার তাদের দেওয়া পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে না, সরকার রাজনৈতিকভাবে পাসের হার নির্ধারণ করে। বিএনপির আন্দোলনের বছর পাসের হার কম দেখানো হতো যেন বিএনপিকে গালাগাল করা যায়। পরের বছর আবার শিক্ষার বাম্পার ফলন দেখাতে পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর জোয়ার বয়ে যায়। হাইব্রিড রেজাল্ট নিয়ে বেশি সমালোচনা হলে পরের বছর রাশ টেনে ধরা হয়, তাতে হার কমে যায়। পাসের হার কোন বছর কেমন হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী পরীক্ষকদের নম্বর কম বা বেশি দেওয়ার নির্দেশনা থাকে।

দুই বছর আগে ফেনিতে আরাফাত শাওন নামে এক কিশোর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৮৩ পেয়েছিল। জিপিএ-৫ পায়নি বলে সবাই তাকে বকাঝকা করেছিল। অভিমানে শাওন আত্মহত্যা করেছিল। তার আগে লিখে যাওয়া এক সুইসাইড নোটে শাওন সরকারের এই নম্বর বাড়ানো-কমানোর কৌশলের কথা লিখে গিয়েছিল।

শিক্ষা নিয়ে সরকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনও শেষ নেই। ২০১৬ সালের ২১ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সে বছরই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার ঘোষণায় অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, অনেকেই ছুটির প্ল্যান করেছিল। কিন্তু পরের সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়, পিইসি পরীক্ষা বহাল থাকবে।
দুই বছর আগে এই এমসিকিউ নিয়ে আরেকদফা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল।

এইচএসসির প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর নম্বর বণ্টন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। আগে এমসিকিউ ছিল ৪০ আর সৃজনশীল ৬০। শেষ মুহূর্তে সেটা বদলে করা হয়েছিল ৩০ ও ৭০। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার টেবিল ফেলে রাজপথে নেমে এসেছিল। কিন্তু ঠেকাতে পারেনি।

পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা চলুক, চলতে থাকুক। দয়া করে সেই নিরীক্ষায় আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না। আপনার মন্ত্রণালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে ঠাণ্ডা মাথায় পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা করুন। সেটার পাইলট করুন। তারপর যা ইচ্ছা তাই চাপিয়ে দিন। কিন্তু একবার হবে না, একবার হবে, এমসিকিউ থাকবে, এমসিকিউ থাকবে না— এমন পেন্ডুলামে দোলাবেন না শিশুদের জীবন। আমার আশঙ্কা, মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানেরা হয় ইংলিশ মিডিয়াম, নয় বিদেশে পড়াশোনা করেন। তাই তারা সম্ভবত শিশুদের মনস্তত্বটা ঠিক বোঝেন না। নইলে বুঝতেন, এই দোলাচল শিশু মনে কী সাংঘাতিক বিরূপ প্রভাব ফেলে। শুরুতেই তারা বুঝে যায়, শিক্ষা একটি জটিল ও বিরক্তিকর বিষয়।

এমসিকিউ বাতিল করুন, আপত্তি নেই। তবে তার বিকল্প কী হবে, সেটা আগে ঠিক করুন, সেটা নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলুন। আর এসএসসি, এইচএসসি শিক্ষার্থীরা যেন পুরো সময়টা একইভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে, তা নিশ্চিত করুন। প্রস্তুতি অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন কিছু চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়

এই দাবিটা আমি শিক্ষামন্ত্রীর কাছেই করতাম। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে বেচারা এমন লেজেগোবরে আছেন, তাকে আর ঝামেলায় ফেরতে চাই না। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে এমসিকিউ বাদ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলার পর আর কারো সাহস হবে না, তার বিরোধিতা করার। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, এমসিকিউ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করুন, তবে আগামী বছর থেকেই নয়, আরও একবছর সময় নিয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশুদের মনস্তত্বটা সবচেয়ে ভালো বোঝেন।

তিনিই পারবেন, প্রস্তুতির অর্ধেকের বেশি পেরিয়ে যাওয়ার পর এমসিকিউ বিতর্কের কবল থেকে শিশুদের বাঁচাতে। প্লিজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT