বিজয়ের মাসের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক বিজয়ের মাসের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক – CTG Journal

রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
বিজয়ের মাসের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক

বিজয়ের মাসের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক

এম হাফিজউদ্দিন খান- ডিসেম্বর বাঙালি জাতির বিজয়ের মাস। এটা শুধু আমাদের বিজয়ের মাসই নয়, এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। কারণ যে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিশেষ ঘটনা হিসেবে লেখা থাকবে। একই সঙ্গে এই বিজয় অত্যন্ত আনন্দময় ঘটনা। মনে পড়ে, বিজয় দিবস নিয়ে আমরা অনেক আনন্দ করেছি। ফুর্তি করেছি। সেই সময় আমি চাকরি করতাম, চট্টগ্রামে ছিলাম। রাস্তায় বেরিয়ে আমরা আনন্দ করেছি, বন্ধুদের সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়েছি। জয় বাংলা বলে উল্লাস করেছি। রাতে খবরটা পেলাম রেডিওর মাধ্যমে। সেই আনন্দের অনুভূতি কী গভীর ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

বিজয়ের এত বছর পর, অনেক কথা মনে ভাসে। যে স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম, আজ এত বছর পরে সেই আনন্দের কোনো চিহ্ন বা সাফল্যের রেশ কি দেখা যায়?

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য আমাদের যে ত্যাগ, রক্তদান এবং তুমুল লড়াই চলেছিল, স্বাধীনতার এত দিন পরে কি সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে? আমাদের অনেক চাওয়ার একটি ছিল—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাওয়া। আমরা কি গণতন্ত্র পেয়েছি? আইনের শাসন কি পেয়েছি? এখানে আইনের শাসন কি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে?

এসব এমন একটি জটিল বিষয়, এক কথায় এর উত্তর পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র না থাকা বা গণতন্ত্রের বিশেষ চর্চা না থাকার অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে যে কারণটিকে বড় করে সামনে আনা যায় তা হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যর্থতা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা ধরনের নীতি ও আদর্শ কাজ করে। অনেক রকম প্রবণতা আছে দলের মধ্যে। আওয়ামী লীগ চায় একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে। বিরোধী দলকে তারা একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। সরকারের বাইরে বিরোধী দল অনেক চাপে আছে। তারা বড় কোনো কিছু করতে পারছে না। এক হিসেবে বলা যায়, তারা কোনো আদর্শিক বা যৌক্তিক দাবি আদায়ে বা রাজনৈতিকভাবেও উঠে দাঁড়াতেই পারছে না। এটা তাদের বলা যেতে পারে একরকম ব্যর্থতা কিংবা সরকারের নানা ধরনের কৌশলে তারা দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না।

কিন্তু এসব প্রসঙ্গে নানা মুনির নানা মত থাকলেও সত্য এই যে যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দল বড় ফ্যাক্টর। কারণ বিরোধী দল না থাকলে তো গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্রের চর্চা না থাকলে সেই দেশ বেশি দূর এগোতে পারে কি? আমরা তা মনে হয় না।

রাজপথে যেমন বিরোধী দল তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না দীর্ঘদিন ধরে পার্লামেন্টেও তাদের উল্লেখ করার মতো ভূমিকা ও প্রভাব নেই। এভাবে একতরফা রাজনীতির চর্চা হলে সেখানে গণতন্ত্র টিকবে কী করে? নির্বাচনে বিজয়ী কোনো একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেমন সরকার গঠন করবে, একটি সুন্দর ও শক্ত অবস্থান নেবে; তেমনিভাবে বিরোধী দলেরও সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশেষ ভূমিকা থাকবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হোক বা সামাজিক কোনো বিষয়ে আন্দোলনে বিরাধী দল যে ভূমিকা নিতে পারে, তাতে সরকার নড়ে বসবে, সাবধান হবে এবং তাদের ভুলগুলো শুধরে নেবে। বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেবে কিংবা বিবেচনা করবে। আর সামাজিক যে সমস্যা ও প্রয়োজনীয় দিক—সেসব বিষয়ে নজর দেবে। সামাজিক কোনো সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হলে তা যদি দরকারি হয়, সেই সমস্যা দূরীকরণে ভালো ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। কিন্তু না, বাস্তবে সেই ধরনের কোনো পরিবেশ, আন্দোলন বা মানসিকতার প্রকাশ দেখি না। এটা যে বিশেষ কোনো দলের প্রবণতা তা নয়, ক্ষমতায় যারা যায়, তারা গণতন্ত্রকে কুক্ষিগত করে ফেলে। এই প্রবণতা ভালো নয়। বলা যায়, আমরা যে নানাভাবে পিছিয়ে যাই, এসব প্রবণতা তার পেছনে কাজ করে থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের বিজয়ের সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। অন্য দেশের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার পেয়েছি, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বাদ আমরা পাইনি।

আমরা এখন সব সময় বলি যে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর কাছে রোল মডেল হয়েছে। কিন্তু কিভাবে বাংলাদেশ রোল মডেল হয়েছে, তা তো আমি বুঝতে পারি না। রোল মডেলের প্রসঙ্গ বা তুলনা তো তখনই আসবে, যখন নানা ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ সফলতা দেখাতে পারব। আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাত্রা করেছি। এটা একটা বড় ব্যাপার। কিন্তু আমাদের কোন খাতটি বিশেষভাবে উন্নয়ন করেছে? কৃষি খাতে কৃষকরা কত কষ্ট করে ফসল ফলায়, তারা তো ন্যায্য মূল্য পায় না। কাজেই এখনো কৃষকের মুখে হাসি নেই। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা তো নাজুক। আমাদের বিশাল আকারের বেকার সমস্যা আছে। তাই রোল মডেলের বিষয়টি এখনো মনে করি প্রক্রিয়াধীন।

বিজয়ের এই মাসেআমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নানাভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। যেসব বীরের অতুলনীয় ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতার আনন্দ পেয়েছি, প্রত্যেককে আমরা মাথায় করে রাখব। আমি নিজে সরাসরি যুদ্ধ করতে পারিনি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবে, সেই স্বপ্ন ও ভাবনায় অনেক কষ্ট করেছি, ত্যাগ স্বীকার করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার পরিবারের অনেকে এবং অনেক আত্মীয় অংশ নিয়েছেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন। তবু তো সেই সময় আনন্দ ছিল তীব্র, দেশ স্বাধীন হবে। দেশ স্বাধীন হলেই আমরা আমাদের সব কিছু ফিরে পাব। গণতন্ত্র পাব। জীবনের স্থিতি ও সম্মান পাব। নিরাপত্তা পাব। দেশে গণতন্ত্রের চর্চা থাকবে। স্বাধীনতা থাকবে। এখন তো সেসব দুরাশা মনে হয়। 

আমরা তো সরকারি চাকরি করেছি। যখন চাকরি করি, তখন আমাদের বিভাগের একটি দায়িত্ব ছিল বাজার তদারকি করা। কোন পণ্যের কী দর চলছে বাজারে, এ বিষয়ে সাপ্তাহিক, কখনো মাসিক প্রতিবেদন জমা দিতে হতো। আমি নিজেও দুই বছর এই কাজ করেছি। এর ফলে যেটা হতো, সরকার সব সময় জানতে পারত বা তাদের নজরে থাকত যে বাজারের কী অবস্থা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সেই প্রতিবেদন আমাদের নিয়ম করে জমা দিতে হতো। সেই নিয়ম কি এখন নেই?

বর্তমানে নিত্যপণ্যের বাজার যেভাবে দ্রুতগতিতে ওঠা-নামা করে, তা দেখে নাভিশ্বাস অবস্থা আমাদের। এইতো গত পরশু দিনও আমি নিজে বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনেছি ২৩০ টাকা করে কিলোগ্রাম। অনেক দিন ধরেই পেঁয়াজ নিয়ে এমন কঠিন ব্যাপার চলে আসছে। এটা নিশ্চয়ই কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি। তা হোক, কিন্তু সরকার এ বিষয়ে ভালো কোনো খবর বা অবস্থা তৈরি করতে পারেনি। এটা তো কোনো ভালো লক্ষণ নয়।

শীতকাল এলে বাজারে সবজিতে সয়লাব হয়ে যায়। দামও থাকত খুব স্বাভাবিক। মানুষ শীতকালে অন্তত সবজি কিনে আনন্দ পেয়ে এসেছে। এখন তো পুরো শীত মৌসুম চলে এসেছে। কিন্তু বাজারে শীতের সবজির এত দাম, ভাবা যায় না। একটা মাঝারি আকারের ফুলকপির দাম ৫০ টাকা। আর বলা যায়, ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেইও। সময় এত দ্রুত উল্টে যাচ্ছে, তা দেখে ও শুনে ভয় লাগে। কী একটা সময় আমরা পার করছি।

গত বছর আমরা দেখেছি, ধান নিয়ে কৃষকের হাহাকার ও কান্না। অনেক জায়গায় কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেয়ে পাকা ধানের জমিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। পরে কি সেই অবস্থা এসেছে যে কৃষক তার দুঃখ ভুলে যেতে পারে? আবার পেঁয়াজের যে এত দাম, কৃষক তার সুফল পাচ্ছে?

বিজয়ের মাসেও আমাদের মনে বিজয়ের আনন্দ নেই। নানাভাবে আমরা সাধারণ নাগরিক কোণঠাসা হয়ে আছি। এ অবস্থার উন্নয়ন দরকার। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে হবে না। মানুষের ভালো থাকার ছোট ছোট বিষয়ও জরুরিভাবে দেখার সময় এসেছে বলে মনে করি। সরকারকে এখনই কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। নিত্যপণ্য, জীবনের নিরাপত্তা, বেকার সমস্যা, দরকারি উন্নয়নমূলক কাজ আগে করা, বিদেশে শ্রমিক কেমন আছে ইত্যাদি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ না নিলেই নয়। এ বিষয়গুলোতে আন্তরিকভাবে দেখভাল করলে এবং নিরাপত্তায় জোর দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে বলে মনে করি।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT