মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘অস্বীকৃতির’ রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘অস্বীকৃতির’ রাজনীতি – CTG Journal

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন

        English
শিরোনাম :
গ্রেফতার এড়াতে দাড়ি কেটে ফেলে সাইফুর, ভারতে পালাতে চেয়েছিল অর্জুন সিলেটের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে: ওবায়দুল কাদের পাহাড়তলীতে ‘স্বীকৃতি’ নামের ভুয়া এনজিওতে র‌্যাবের অভিযান মাসের পর মাস আইসোলেশন: আমাদের শরীরে কী প্রভাব ফেলছে ষড়যন্ত্র করে আ.লীগই ক্ষমতা নিয়েছে: বিএনপি সরকারি কলেজের ৮ শিক্ষকের সনদ ভুয়া, থানায় মামলার নির্দেশ পানির নিচে রংপুর শহর! ইউনুছ আলী আকন্দকে আইনজীবী পেশা থেকে ২ সপ্তাহের জন্য অব্যাহতি লামায় গ্রাউসের আন্ত: ধর্মীয় সংলাপ করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত ২৬, মৃত্যু ১ দূতাবাস নয়, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যাবে এজেন্সির মাধ্যমে
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘অস্বীকৃতির’ রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘অস্বীকৃতির’ রাজনীতি

♦ জোবাইদা নাসরীন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ  ভয়াল সেই রাতে অপরেশন সার্চলাইটে প্রথম আক্রমণ করা হয় ঢাকার পিলখানায়।  সেখানে আক্রান্ত হয়েছিল পিলখানার অভ্যন্তরে থাকা সুইপার কলোনি।  শহীদ হয়েছিলেন কয়েকজন।  রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি করা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস– বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে আছে সেই সুইপারদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার। যাদের মধ্যে আছেন মেথর, মুচি, ডোমসহ বেশ কিছু পেশার মানুষ। তারা সেই ভয়াল রাতের সাক্ষী দিয়েছেন। কিন্তু সেই রাতে শহীদ সুপারদের কেউই শহীদের তালিকায় স্থান পাননি।  শুধু ঢাকা পিলখানা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুইপার কলোনিগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালিয়েছিল।  সেই পরিবারগুলো শুধু হয়তো তাদের বাবা-মা হারানোর কথা মুখেই বলে। কিন্তু ইতিহাস লেখনী তাদের স্থান দেয়নি, কারণ তারা সমাজে ক্ষমতা কাঠামোর কেউ নয়।

ইতিহাসের ‘অস্বীকৃতি’র রাজনীতি

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনায় যা বলা হয় তা কার্যত সমাজের অধিপতি লোকদের ভাষ্য। ইতিহাসের এই ‘সাধারণ’ বোধ খণ্ডিত হয় যখন কেউ ইতিহাসের এই বিশেষায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। কী প্রক্রিয়ায় কালক্রমে কেবল কিছু উপাদান ইতিহাসের অংশ হয়? কিভাবে কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা কিংবা প্রথম ইতিহাসের অংশ হয় এবং কোনটি হয় না তা এমন একটি মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয় যা রাষ্ট্রীয় আধিপত্যশীল মূল্যবোধের পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং ইতিহাসের চরিত্র নির্দিষ্ট করে। এই কারণে ইতিহাসের বোধের ক্ষেত্রে বলা হয় যে, তা রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে অতীতকে মূল্যায়ন করে ও সাবজেক্টে এ পরিণত করে।

মুক্তিযুদ্ধে দলিত জনগণ

চাঁদপুরে একজন দলিত নারী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার হন। স্বাধীনতার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পায়নি এসব মুক্তিবাহিনীর সহযোগী পারিবারগুলো। তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পায়নি এমন অনেক দলিত রয়েছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেনি আজও স্বর্ণখোলা হরিজন কলোনির দলিত হরিজনরা। তাদের জানা মতে ওই সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় যারা এগিয়ে গিয়েছিলেন তারা হচ্ছেন, ফনিলাল বাসফোর, জগন্নাথ হরিজন, লক্ষণ লাল হরিজন, কিনন লাল ডোম, ডেউয়া ডোম, রাম প্রসাদ হরিজন, রামপল হরিজন, রাধামহন হরিজন, মণি লাল হরিজন, কালিদিন হরিজন, ছোট লাল, নারায়ন হরিজন, পুরন হরিজনসহ অসংখ্য হরিজন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাদের নাম আসেনি। যার ফলে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সব সুযোগ সুবিধা পাওয়ার কথা তা পাননি। বর্তমানেও তারা অবহেলিত।

মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে এ সম্পর্কিত কিছু বিবরণ পাওয়া যেতে পারে। রাবেয়া খাতুন নামে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এক সুইপার এরকম একটি বিবরণ দিয়েছেন-‘২৫ মার্চের কালরাতের অতর্কিত হামলার সময় সুইপার রাবেয়া ছিলেন রাজারবাগ এসএএফ ক্যান্টিনে। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাঙ্কের বিকট এবং অবিরাম গর্জন। থরথরিয়ে কাঁপতে থাকেন রাবেয়া ব্যারাকের ভিতর। সারারাত ঘাপটি মেরে থাকে সে। সকালে ব্যারাকে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে বাঙালি পুলিশের সারা শরীরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, বেটন চার্জ করে এবং বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে আনা হয়। তখন রেহাই পাননি সুইপার রাবেয়া। তাকে ২৬ মার্চই হানাদার সেনারা খুঁজে পায় এবং ধর্ষণ শুরু করে। পুলিশ লাইনের ময়লা পরিষ্কার না হতে পারে বিধায় তাকে আর প্রাণে মারা হয়নি। একদিন পাশবিক অত্যাচারের পর তাকে টানতে টানতে বারান্দায় এনে মেরে ফেলার উপক্রম হয়।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের নাপিত রমণীমোহন শীল।  কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। মণীমোহন শীল হিন্দু হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি মিলেটারিদের প্রয়োজনেই। কারণ তাদের মৃত্যু হলে পাকিস্তানি সৈন্যদের চুল-দাড়ি কাটার মতো কোনও লোক থাকবে না।

এই সাক্ষাৎকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দলিত মানুষদের ভূমিকা। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ কিংবা বীরাঙ্গনা তালিকাতেও স্থান হয়নি এই দলিত মানুষদের। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে এই মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও স্বাধীন দেশে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন খুব কমই ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতকে এভাবেই দেখেছেন সৈয়দপুরের সুইপার জোৎস্না বাসফোর। সিরডাপে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভায় জোৎস্না বলছিলেন,  ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবা মারা গেছেন, আমার বোনকে দংশন করছে (ধর্ষণ অর্থে), কিন্তু এখনও আমার ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। দেশ স্বাধীন হওয়া আমাদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আনেনি।’

জোৎস্না শুধু নয়, এই কথাটি হয়তো বাংলাদেশে বসবাসরত বেশিরভাগ ‘নিম্নবর্গে’র মানুষের। এই মানুষেরা স্থান পায়নি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও।

সমঅধিকারের চেতনা যেখানে অস্পৃশ্যতায় মোড়া

সমঅধিকার এবং বৈষম্যহীনতা বাংলাদেশে রাষ্ট্রটির চেতনাগত অঙ্গীকার। তা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে। এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলো।  যেখানে নিম্নবর্গের চা শ্রমিকরা জীবন দিয়েছেন, অনেক চা শ্রমিক নারী শহীদ হয়েছেন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছেন- তাদের জায়গাও হয়নি ইতিহাসে।  দফায় দফায় তারা শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়ও তাদের নাম নেই। পাননি কোনও সম্মান কিংবা বিশেষ ভাতা।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বড় ধরনের অবদান রাখার পরও শিক্ষার সুযোগেই তারা দীর্ঘদিন পাননি, চাকরির কোটা তো অনেক দূরে।  এখনও দৈনিক ৫০ টাকা আয় করা অনেকের কাছে স্বপ্নের বিষয়।  মেলেনি তার শ্রমের মুক্তি, আটকে থাকা শ্রমিক জীবনের মুক্তি।

কানপুরী, তেলেগু, ঋষি, কাওরা, বেঁদে, রবিদাস, পৌন্ড্র, নিকারী, শিকারীসহ প্রায় শতাধিক জাতিগোষ্ঠী পরিচয়ে আনুমানিক ৬৫ লাখ দলিত মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে সুইপার, চা-শ্রমিক, মুচি, ধোপা, ডোম, মেথর ইত্যাদি পেশায় সেবাশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, বিনিময়ে তারা পেয়েছেন দারিদ্র্য ও অচ্ছ্যুৎ পরিচয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও এ জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবজ্ঞা আর বঞ্চনা যেন ‘স্বাভাবিক’ ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ব্যাপার। দেশের কোথাও কোথাও তারা হোটেল-রেস্টুরেন্টে, নাপিতের দোকান এমনকি পবিত্র মন্দিরেও প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার শিকার হন। কখনও কখনও দলিত শিশুদের স্কুল থেকেও বের করে দেওয়া হয়।

ইতিহাস নির্মাণের আর ওই রাজনীতি চর্চার মধ্য দিয়ে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন এবং ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনে থাকা এদেশের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও একটি ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষা। মুক্তি নামক এক স্বপ্নের ওপর ভর দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ একের পর এক আন্দোলনে ঝাঁপ দিয়েছেন। কিন্তু মুক্তি মিলেনি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল ধর্ম, বর্ণ গোষ্ঠী, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাদের সঠিক স্থান না হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র একভাবে এই অসমতাকে অনুমোদন দেয়।

জাতি, ভাষা, ধর্ম বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চলভিত্তিক নিরপেক্ষতাই আসলে আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।  আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানেই বৈষম্যহীন সমাজের জন্য কাজ করা, সমাধিকার এবং ভূমি এবং ইতিহাসের মালিকানায় উত্তরাধিকারী হওয়া।  তাই এই ভূখণ্ডের জঙ্গল, জমি জল, বন্দর, বিদ্যুত, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ সকল রক্ষা করার দায়িত্ব আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়।  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে জমি দখল, জঙ্গল চুক্তি, সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ, লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুর ওপর আঘাত, মুক্ত চিন্তার ওপর নজরদারি, আদিবাসী স্বীকৃতির দাবির বিপরীতে অনড়তা, নারী ও সংখ্যালঘুর ওপর মানসিক টেনশন তৈরি-কোনোভাবেই গ্রহণীয় নয়।  বরং এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত এবং সংঘর্ষমূলক।

একদিকে ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বিভিন্ন ‘নিম্নবর্গে’র মানুষকে স্থান দিতে যেভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণও একইভাবে উপেক্ষা করেছে ‘নিম্নবর্গে’র মানুষের অবদান ও অংশগ্রহণ।  উভয় ইতিহাসেই প্রবল শ্রেণির প্রাধ্যান্য লক্ষ্যণীয়। ব্রিটিশ বিরোধীর প্রেক্ষাপটে যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয়েছিল সেই জাতীয়তাবাদের পরিসর নির্মিত ইতিহাস ‘নিম্নবর্গে’র মানুষের ঐতিহাসিক ও স্থানিক অবদানকে অস্বীকার করেছে। সব সময় তাদের অবস্থা ছিল নিকৃষ্ট ‘অন্যের’ ভূমিকায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরও এই ইতিহাস নির্মাণের সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে এবং ইতিহাস নির্মাণের ধারণায় অচিহ্নিতায়ন জারি রয়েছে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলzobaidanasreen@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT