সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সামনে কঠিন সমীকরণ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সামনে কঠিন সমীকরণ – CTG Journal

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
কাপ্তাইয়ে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উদযাপন কাজের জন্য সৌদি আরবে যেতে চাইলে চাকরিদাতার ছাড়পত্র লাগবে করোনাভাইরাস: দেশে ৩২ জন মৃত্যুর দিনে শনাক্ত ১,৪৩৬ বান্দরবান সাংবাদিক ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ রায় শুনে কেঁদেছেন রিফাতের বাবা: জানালেন সন্তুষ্টি কথা চট্টগ্রামে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাবে সাড়ে ৫ লাখ শিশু খাগড়াছড়িতে ধর্ষণ রোধে পদক্ষেপ জানতে চেয়ে ডিসিকে আইনি নোটিশ বান্দরবানে এ” প্লাস ক্যাম্পেইন উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের কর্মশালা বন্যা: কুড়িগ্রামে কর্মহীনতা ও খাদ্য সংকট প্রকট রিফাত হত্যা: মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসির রায় ইকামার মেয়াদ বাড়ানোর কোনও ঘোষণা সৌদি সরকার দেয়নি! করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা তিন কোটি ৩৮ লাখ ছাড়িয়েছে
সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সামনে কঠিন সমীকরণ

সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সামনে কঠিন সমীকরণ

♦ আনিস আলমগীরঃ

২০১৮ সালের শেষে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের ছোট বড় দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য। সম্প্রতি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নামে আরেকটি জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তফ্রন্টের শরিক দল হচ্ছে– বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ স ম রবের জাসদ, কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং মাহামুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই জোটকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বামপন্থীরাও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি দিচ্ছেন। অচিরেই বামদের সমন্বয়ে আরেকটি জোট আত্মপ্রকাশ করার সব ব্যবস্থাই মনে হচ্ছে পাকাপাকি হয়ে গেছে। যদি জোটগতভাবে কোনও সমন্বয় না হয় তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট, জাতীয় পার্টির জোট, যুক্তফ্রন্ট আর বামদলীয় জোট অর্থাৎ সর্বমোট ৫টি জোট নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান হয়েছে।
২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কী করবে না তা এখনও নিশ্চিত নয় কারণ তারা বলে আসছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। অন্য জোটগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তেমন কোনও কঠিন কথাবার্তা এখনও বলেনি। অবশ্য ১৪ দলীয় জোট এবং ২০ দলীয় জোট ছাড়া অপর তিন জোট যদি সুষ্ঠু রাজনীতি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে তবে দেশে একটা গঠনমূলক বিরোধী দল আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা দেখা দেবে।

সংসদ বিরোধী দল শূন্য আর মাঠে পরস্পরের গ্রেনেড ছোড়াছুড়ি– গত ২৭ বছরব্যাপী বিরোধীদল মানে এ দৃশ্যই জাতি দেখেছে। মানুষ এখন রাজনৈতিক কর্মসূচি উপেক্ষা করে চলে। কারণ রাজনীতি মানুষের কোনও উপকারে আসছে না। এখন রাজনীতিবিদেরা গঠনমূলক সুন্দর কথা বলার সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্মৃত হয়ে গেছে। বিরোধী দলও স্বৈরাচারী হতে পারে বিশ্বের লোক এ দৃশ্যটা বাংলাদেশেই দেখেছে। মানুষ হত্যা করা আর সরকারি সম্পদে আগুন দেওয়াই যদি বিরোধী দলীয় কর্মকাণ্ড হয় তবে মানুষ তাতে যোগদান করবে কেন?

বিডিআর মামলার রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন দেশব্যাপী বিডিআর-এর এই বিদ্রোহ আর দরবার হলে ও পিলখানায় ৭৩ জন অফিসারের হত্যাকাণ্ডে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। হাইকোর্ট এ বিষয়ে তদন্তের কথাও বলেছেন। বিডিআর বিদ্রোহে জাতীয় পর্যায়ে যদি কারও কন্ট্রিবিউশন থাকে তবে তা রাজনীতিবিদেরই রয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি। কারণ আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ নির্মূল করার জন্য জনসভায় গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা দেখেছি। সরকারি দলকে বিরোধী নেত্রীর হ্যান্ডব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে যাওয়ার অলিক অভিযোগের কথা বলতে শুনেছি। জজ মিঞার মতো এক আনকোরা যুবককে প্রধান আসামি করে গ্রেনেড হামলার চার্জশিট দিতেও দেখেছি।

একবার দেখেছি ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণের প্রচেষ্টা আরেকবার দেখেছি সিলেটে ব্রিটেনের হাই কমিশনারকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হত্যার প্রচেষ্টা। উভয় প্রচেষ্টা সফল হলে কত বড় বিপর্যয় নেমে আসতো। ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণ করে হত্যার প্রচেষ্টা সফল হলে নিশ্চয়ই ভারতীয় সেনাদল বাংলাদেশে তল্লাসীর নামে প্রবেশ করা বিচিত্র ছিল না। এবং ভারতীয় সেনার প্রবেশ কত বিচিত্র সমস্যা সৃষ্টি করতো তা কল্পনা করলেও গা শিউরে ওঠে।

পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের সময় ধানমন্ডির ৪নং রোডের উভয় অংশে সামরিক বাহিনীর সেনা সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী তার দলের কিছু নেতাকে পিলখানায় পাঠিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে সব নেতা আলাপ করেছিলেন তারা সফলতার সঙ্গে বিদ্রোহে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাজির করতে পেরেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী বিচক্ষণতার সঙ্গে ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পেরেছিলেন।

যদি প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হতেন তবে ৪নং রোডে অবস্থানরত সেনা সদস্যরা পিলখানা আক্রমণ করতো তখন সারা দেশে সেনাবাহিনী ও বিডিআর এর মাঝে এক প্রকার যুদ্ধই হতো আর এভাবে দেশরক্ষা বাহিনীর শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যেতো। আমরা তখন লক্ষ্য করেছি সরকার সেনা সদস্যদের আক্রমণের হুকুম দিচ্ছিলেন না বলে সেনা সদস্যদের মাঝে চরম উত্তেজনা বিরাজ করেছিলো। প্রধানমন্ত্রী এ উত্তেজনার মাঝে কুর্মিটোলা সেনা ছাউনিতে উত্তেজিত সেনা অফিসারদের সঙ্গে তার মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে বৈঠক করেছিলেন।

হাইকোর্ট বলেছেন, এখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। আগেই বলেছি জাতীয় ষড়যন্ত্র মানেই হলো রাজনীতিবিদেরা ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বিরোধী দলের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে এই ষড়যন্ত্রে তাদের যুক্ত থাকা বিচিত্র মনে হবে না। এ ধরনের রাজনীতি কার কী উপকারে এসেছে তা নিরূপণ করার কেউ কখনও চেষ্টা করেনি তবে হত্যার অনাচারে বহু লোক প্রাণ হারিয়েছে।

অরাজনীতিই বার বার প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতি ১৯৭৫ সালে শেষ। তারপর যারা রাজনীতিতে এসেছেন তারা ধুর্ত আবরণে এক দুষ্ট রাজনীতির প্রসার ঘটিয়েছেন। তাদের দুষ্টামিতে রাজনীতি বিকলাঙ্গ হয়েছে। টাকা রোজগারের হাতিয়ার হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষে যুক্তফ্রন্ট আর বামফ্রন্টের কাছে প্রত্যাশা করে তারা দেশে একটা সুন্দর গঠনমূলক রাজনীতির ধারা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হবেন। তবে সে প্রত্যাশা তারা পূরণ করতে কতটা পারবে তাতে আমি সন্দিহান।

দেশের মানুষ কোনও সুষ্ঠ ধারা পাচ্ছে না তাই অকুলীন কুলীন হয়েছে। বিএনপি দেশ চালাতে গিয়ে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিলো আর বিরোধী দলে অবস্থান নিয়ে রাজনীতির মাঝে অরাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে আর বিকৃত মৌলবাদকে নিজের দোসর বানিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। হাত কাটা, রগ কাটা হত্যার রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের কথা বলছে কিন্তু রাজনীতির পুরনো ধারায় কোনও পরিবর্তন আসেনি। ঘুষ, দুর্নীতি, বাজার মূল্যের ঊর্ধ্বধারা অব্যাহত আছে। আমলাদের বেতন বাড়ছে, ব্যবসায়ীদের হয়রানি আর কর বাড়ছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিনতর হচ্ছে।

বিএনপি এখন বলছেন তাদের বিরুদ্ধে রুজু করা সব মামলাই নাকি মিথ্যা মামলা। ২০০২ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হত্যা মামলাও কি মিথ্যা মামলা? দশ ট্রাক অস্ত্রের মামলাও কি মিথ্যা মামলা? মওদুদ সাহেবের বাড়ির মামলাও কি মিথ্যা মামলা? মওদুদ সাহেব খাড়া দলিলে প্রাপ্ত বাড়ির মালিকানা সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। তারেক আর গিয়াস উদ্দীন মামুনের মানি লন্ডারিং এর যে টাকা সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত পাঠালো সে মানিলন্ডারিংও কি মিথ্যা? ড. মোশাররফের মানি লন্ডারিং মামলাও কি মিথ্যা?

এখন নাকি সৌদি রাজকুমার তালাল বলেছেন তার কাছে বেগম জিয়া তারেক জিয়ার গচ্ছিত টাকা আছে। তা দিয়ে সে ব্যবসা করে। তাদেরকে লভ্যাংশ প্রদান করে। দু’দককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা তদন্ত করতে। দেখি সেটা কতটুকু মিথ্য।

নির্বাচন প্রসঙ্গে আসা যাক। গত ৭ ডিসেম্বরের পত্রিকায় দেখলাম বিএনপির মহাসচিব বলেছেন তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। অথচ বেগম জিয়াসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতা বলেছেন শেখ হাসিনার অধীনে তারা কোনও নির্বাচনে যাবেন না। কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট কথা নেই। রিজভী এক কথা বলতো গায়েশ্বর আরেক কথা বলে। মওদুদ নির্বাচনে যাওয়ার কথা বললে ড. মোশাররফ না যাওয়ার কথা বলে। আসলে তারা বিভ্রান্তিতে ভুগছে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে।

তারেক জিয়ার মানি লন্ডারিং মামলায় সাড়ে সাত বছর জেল হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার দুর্নীতি মামলায় জেল হয়েছে ১০ বছর। তার সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আরও কিছু নেতার মামলা চলছে। নির্বাচনের আগে বিশিষ্ট নেতাদের বিচার সম্পন্ন হলে বেগম জিয়াসহ অনেক নেতা সাজার কারণে (যদি সাজা হয়) হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। অনুরূপ পরিস্থতির উদ্ভব হলে কী অবস্থা হবে সম্ভবতো তাই নিয়েই তারা উদ্বিগ্ন।

অনেক নেতা বলছেন, শাস্তি হলে তারা আপিলও করবেন রাজনৈতিক আন্দোলনও করবেন। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কিনা তা বলছেন না। হয়ত বা দু/এক মাসের মাঝে বিএনপি এমন দুর্যোগের পতিত হবে যে রাজনীতির মতো পথের সমীকরণ করাই তার পক্ষে কঠিন হবে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হয়তো আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হবে তবে নির্বাচন হতে কোনও অসুবিধা হবে না। কারণ আওয়ামী জোট, এরশাদ জোট, বাম জোট ও যুক্তফ্রন্ট- সম্ভবতো এ জোটগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যও ছাড় দেওয়ার লক্ষণ ছিল না। বিএনপি নির্বাচনে আসলে আসবে না আসলে তাদের ডেকে আনার গরজ নেই– প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এমন ধরনের। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটও নির্বাচনে আসবে কারণ দল বাঁচলে পুনরুত্থানের সম্ভাবনা থাকে– এ কথা না বুঝার কিছু নেই।

দীর্ঘ ২১ বছর রাজপথে দিন অতিবাহিত করে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগওতো ক্ষমতায় এসেছে। জামায়াতের কথায় যদি তারা আন্দোলনে যায় তবে ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনাই থাকবে বেশি। কারণ এখনতো সময় শেষ। আন্দোলন করার জন্য জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে চাইলে এক বছর প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। বিএনপি কর্মীরা আন্দোলনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় হাঁকডাক দিলেও– জনগণের যেমন আন্দোলনে সাড়া দেওয়ার মুড নেই, বিএনপির হাতেও সময় নেই। বিগত দিনের মতোই জনসম্পৃক্ত বিষয়ের চেয়ে বিএনপিকে তার শীর্ষ নেতা নেত্রীদের সৃষ্ট জঞ্জাল নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে মনে হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT