ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা কতদূর ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা কতদূর – CTG Journal

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
মানিকগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন ৪ খুনের রহস্য উন্মোচন: খোটা দেওয়ায় পরিবারসহ ভাইকে খুন প্রধানমন্ত্রী যা আহ্বান করেন জনগণ তাতেই সাড়া দেয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরগুনায় সৌদি প্রবাসীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা: পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ সাংবাদিক নেতা রুহুল আমীন গাজী গ্রেফতার মানিকছড়িতে প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তার বিদায় অনষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি হচ্ছে গরুর নাড়িভুড়ি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা ফরম পূরণের কিছু টাকা ফেরত পাবে এইচএসসি শিক্ষার্থীরা মহাবিশ্বের নক্ষত্রের চেয়েও বেশি ভাইরাস পৃথিবীতে, কিন্তু সব ভাইরাস দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয় না কেন? কারিগরি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতেই হবে
ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা কতদূর

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা কতদূর

মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মানুষের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর আবর্তন ভূমিকেন্দ্রিক। এরপরও দেশের সরকারি সেবাখাতের মধ্যে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম ভূমি প্রশাসন। এ দুর্নাম মোছা যায়নি। দেশে যত দ্বন্দ্ব-বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা তার বেশির ভাগই ভূমিকেন্দ্রিক। দাফতরিক ব্যবস্থায় ভূমি সংক্রান্ত বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং অস্বচ্ছ।

সেবাগ্রহীতাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জিম্মি থাকতে হয়। আবার ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিয়ে সেবাগ্রহীতারাও কিছু অন্যায় সুবিধা নেন। এগুলো রুখতে ভূমি প্রশাসনের কাজে গতি আনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে যথাযথ সেবা দেওয়ার জন্য ভূমি প্রশাসন তথা ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার তার বিগত আমলেই। এ কাজে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে সরকার দাবি করলেও বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। কিছু কিছু সেবা অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কিছু নথিপত্র ডিজিটালাইজডও হয়েছে। কিন্তু ভূমি প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ও সমন্বিতভাবে ডিজিটালাইজড না হওয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি থেকেই যাচ্ছে এবং এর পরিণামে থাকছে ভোগান্তি-হয়রানি। এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ভূমি হস্তান্তর নিবন্ধন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিলেও এর বাস্তবায়নে কোনও অগ্রগতি তেমন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তনে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে কাজ করছে এ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর তৎপরতা। তারা চান না সরকারের ভূমি ব্যবস্থানায় ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লাগুক।

দেশের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো এ কার্যক্রমের আওতায় এনে সব ধরনের নিবন্ধন ফরম, জমির ধরণ অনুযায়ী নিবন্ধক খরচ এবং এ সংক্রন্ত অন্যান্য তথ্য নিবন্ধন বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষকে আর দলিল লেখক, নকলনবিস বা দালালদের ওপর নির্ভর করতে হতো না। কিন্তু সারাদেশে ৪৭৬টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং ৬১টি জেলা রেজিস্ট্রি মহাফেজখানায় কর্মরত রয়েছেন প্রায় বিশ হাজার নকলনবিস। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় নিবন্ধন কর্মকর্তা-কর্মচারী, নকলনবিস, দলিল লেখক ও স্ট্যাম্প ভেন্ডাররা এই ডিজিটালাইজেশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাইজেশন করা হলে প্রত্যক্ষভাবে রেকর্ড জালিয়াতি করা অসম্ভব। এতে কর্মকর্তাদের ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমবে, ফলে জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমাও কমে যাবে। এ কারণেই সংশ্লিষ্টরা এ উদ্যোগের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪৮৩টি উপজেলার ভূমি কার্যালয়কে ডিজিটাইজ করতে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার কেনার জন্য প্রয়োজন হতে পারে সাত থেকে ১০ কোটি টাকা। একইসঙ্গে বিদ্যমান পাঁচ কোটি জমির রেকর্ড স্ক্যান করতে লাগবে ৬৫ থেকে ৭০ কোটি টাকা। এছাড়া এসব কাজ তদারকিতে প্রতিবছর দফতরের কর্মচারীদের জন্য খরচ হবে ৯ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এই খরচ দাঁড়ায় ২৮০ কোটি টাকার ওপরে।

কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার সম্পাদিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে একটি সাধারণ জমির রেকর্ড-সম্পর্কিত লেনদেনে খরচ হয় এক হাজার ৪৫ টাকা, সময় লাগে ৩০-৪৫ দিন আর সরকারি অফিসে ঘুরতে হয় চার থেকে পাঁচবার। ডিজিটাইজেশন হলে এই খরচ কমে দাঁড়াবে মাত্র ৮০ টাকা, সময় লাগবে মাত্র ১৫ দিন, সরকারি অফিসে যেতে হবে মাত্র দুবার। আইনি ও বেআইনি লেনদেন কমে যাওয়ার কারণে বার্ষিক প্রত্যক্ষ সুফলের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮ দশমিক ২ কোটি টাকা। তাই শুধু প্রত্যক্ষ সুফল বিবেচনা করলে এ কাজে ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বিপরীতে ৩ টাকার সুফল পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন।

সরকার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তি লুকিয়ে আছে ভূমিতে। বাংলাদেশে মোট কৃষিজমির পরিমাণ কতো, বনাঞ্চল কতো, নদী সিকস্তির জরিপ কোনোটাই আধুনিক নিয়মে হয়নি। তারপরও ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যে বাংলাদেশের আয়তন এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। এরমধ্যে স্থলভাগ বা ভূমির আয়তন এক লাখ ৩৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। অবশিষ্ট ১০ হাজার ৯০ বর্গকিলোমিটার জলভাগ বা পানি।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় তিনটি প্রশাসন কাজ করে। প্রথমত, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর (ডিএলআরএস) ভূমি জরিপের দায়িত্ব পালন করে এবং ভূমির স্বত্ত্বলিপি বা রেকর্ড প্রণয়ন করে। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার থেকে শুরু করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেকর্ড হালনাগাদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভূমি রাজস্ব আদায় করেন। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাব-রেজিস্ট্রাররা করেন ভূমি রেজিস্ট্রেশন কাজ। ‘বাংলাদেশ ভূমি প্রশাসন সংস্কার’ প্রকল্পের একটি প্রস্তাবে সরাসরি বলা হয়েছে, রেকর্ডের এ ত্রিমুখী উৎসই হচ্ছে একটি বড় ধরনের ত্রুটি।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি পাঁচ বছরে একবার জরিপ করার কথা আছে, কিন্তু এগুলোর বেশিরভাগই খুব পুরনো। সনাতন পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের কাজ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রথম ভূমি জরিপ কাজ সম্পন্ন করতে সময় লেগেছিল ৫৪ বছর। যা ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস রেকর্ড নামে পরিচিত। সেই জরিপ ১৮৮৭ সালে শুরু হয়ে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চলে। জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ১৯৫৫ সালে স্টেট অ্যাকুইজিশনের আওতায় নতুন কার্যক্রম শুরু হয়। ‘এসএ রেকর্ড’ নামে পরিচিত সে জরিপ সরেজমিনে করা হয়নি। জমিদারদের আওতাধীন প্রজা বা মালিকদের নামে মালিকানা স্বত্ত্ব এবং খাসজমির তালিকা প্রস্তুত করাই ছিল সেই জরিপের উদ্দেশ্য। সেই এসএ রেকর্ড প্রণয়নের কাজ শেষ করতে সময় লাগে ৭ বছর। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সময়সাপেক্ষ ও জটিল সনাতনী পদ্ধতিতেই ভূমি জরিপ পরিচালিত হচ্ছে।

ব্যবস্থাপনার প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি (জিপিএস-গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, ইটিএস-ইলেকট্রনিক টোটাল স্টেশন, ডেটা রেকর্ডার) ইত্যাদি ব্যবহার করে ভূমির জরিপ, আগের পরিবারভিত্তিক খতিয়ানের পরিবর্তে প্লটভিত্তিক খতিয়ান প্রণয়ন এবং এগুলোর ডিজিটাল সংরক্ষণই ডিজিটালকরণ ব্যবস্থার পূর্বশত। এই শর্ত পূরণে প্রাথমিকভাবে নরসিংদী সদর, যশোরের মনিরামপুর এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ডিজিটাল জরিপের প্রকল্প চালুকরণের লক্ষ্যে ৬৮টি ইটিএস, ৯টি ওয়ার্ক স্টেশন, ২৮টি ম্যাপ প্রসেসিং সফটওয়্যার, তিনটি লেজার প্রিন্টার, দুটি ডিজেল জেনারেটরসহ বিভিন্ন আসবাব কেনা হলেও দক্ষ লোকবল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নানা জটিলতায় যন্ত্রগুলোর বেশিরভাগই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বলছেন, সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনায় মানুষের অনেক ভোগান্তি। আর ভোগান্তি থেকেই দুর্নীতির জন্ম। এখন ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যথাসম্ভব অল্পসময়ের মধ্যে তা শেষ করা হবে। কাজ অনেকদূর এগিয়েছে; অনেক দিনের পুরনো পদ্ধতি, ঠিক করতে সময় লাগবে। কাজ যখন শুরু হয়েছে, শেষ তো হবেই। আর এটি শেষ হলে সেবাগ্রহীতা ও কর্মকর্তা সবার জন্যই সুবিধা হবে।

এ প্রসঙ্গে ভূমি প্রতিমন্ত্রী এম. সাইফুজ্জামান সচিবালয়ের একটি সভায় জানিয়েছিলেন, সারাদেশে ৪৫টি উপজেলাকে ডিজিটালাইজড করার কাজ চলছে। এছাড়া, ভূমি জোনিং প্রকল্পের কাজও চলছে। জনগণ এর সুবিধা পাবেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT