উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করবে – CTG Journal

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫০ অপরাহ্ন

        English
শিরোনাম :
মানিকগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন ৪ খুনের রহস্য উন্মোচন: খোটা দেওয়ায় পরিবারসহ ভাইকে খুন প্রধানমন্ত্রী যা আহ্বান করেন জনগণ তাতেই সাড়া দেয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরগুনায় সৌদি প্রবাসীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা: পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ সাংবাদিক নেতা রুহুল আমীন গাজী গ্রেফতার মানিকছড়িতে প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তার বিদায় অনষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি হচ্ছে গরুর নাড়িভুড়ি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা ফরম পূরণের কিছু টাকা ফেরত পাবে এইচএসসি শিক্ষার্থীরা মহাবিশ্বের নক্ষত্রের চেয়েও বেশি ভাইরাস পৃথিবীতে, কিন্তু সব ভাইরাস দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয় না কেন? কারিগরি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতেই হবে
উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করবে

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করবে

♦ সালেহউদ্দিন আহমেদ-

বাংলাদেশ যে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বড় একটি গন্তব্যের দিকে যাত্রা করছে—এটা ভাবতে এক হিসাবে ভালোই লাগছে। বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নের যে ফর্ম চলে আসছে বহুদিন ধরে, সেটার একটা স্বীকৃতি বলতে পারি অনুন্নত দেশ থেকে এলডিসির দিকে যাওয়াটা। আমি মনে করি, এটা একটা পজিটিভ বিষয়, যা সামনে আরো এগিয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে আমাদের জীবনমানকে উন্নত করবে। খুব ইমিডিয়েটলি এটা শুরু হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাকে খুব ভালো খবর বলে বিবেচনা করছি। একটি পার্টিকুলার কোনো সরকারের আমলে এটা সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৯০ সাল থেকে এটার একটা ফ্লো তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে একটু একটু করে এগিয়ে এটাকে গতিশীল করেছে। কিন্তু এই উন্নয়নশীল দেশের সারিতে যাত্রার ফলে যেটা হবে—আমাদের যে ইমেজ, ব্র্যান্ডিং যেটাকে বলি, এই স্বীকৃতি অনেকটা ব্র্যান্ডিংয়ের মতো কাজ করবে।

এই যে একটা নতুন যাত্রা একটি দেশের, যদিও তা কার্যকর হবে আরো ছয় বছর পরে শর্ত পূরণ করা সাপেক্ষে। কিন্তু সম্ভাবনা ও সহযোগিতাটা আমরা পেতে শুরু করব, এতে আমাদের সামাজিক কিছু বিষয়ে উন্নয়ন ঘটবে। যেমন—বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনা, আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আছে যেগুলো আরো প্রসারিত হবে—এটা আশা করা যায়। বিভিন্ন দেশের মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিগুলো আসতে শুরু করবে। আমাদের নিজেদের ব্যবসার বাইরেও নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা ও বাজার তৈরি হবে। পৃথিবীতে যেকোনো অনুন্নত দেশকে সাধারণত অনেকে সহযোগিতা করতে চায়; কিন্তু যৌথভাবে কাজ করা বা বিনিয়োগ করা—এসব বিষয়ে অনেকেই আগ্রহ বোধ করে না। এখন যেটা হবে, আঞ্চলিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা আমরা পেতে শুরু করব। এরপর ব্যবসা ও বৈদেশিক কর্মকাণ্ডের জায়গাগুলো প্রসারিত হবে। এটাকে খুব ভালো একটা দিক বলে ভাবা যেতে পারে। একটা অনুন্নত দেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়ায় তখন বেশ কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়। নতুন নতুন মার্কেট যদি এক্সপ্লোর করতে পারি, আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিকভাবেও সহযোগিতা তৈরির জায়গাগুলো সহজ হয়ে উঠবে। বিদেশি এজেন্সিগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া সহজ হবে এবং বৃদ্ধি পাবে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিকভাবে কাছে আসার, আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগগুলো চলে আসবে। আমাদের সামর্থ্য ও ইমেজের কারণে এখন অনেকেই উত্সাহী হবে। বাণিজ্যিক অফার ও তাদের প্রযুক্তি এবং অর্থ-সম্পদ নিয়ে এগিয়ে আসবে। নানা ধরনের কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনার পথ খুলে যাবে, যা আগে ছিল না।

উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রায় বেশ কিছু সম্ভাবনা যেমন আছে, কিছু সমস্যাও দেখা দেবে, যেগুলো সচেতনভাবে হ্যান্ডেল করেত হবে। আর সমস্যার বিষয়গুলো, তিনটা সূচকে তো বিষয়গুলো ঘটবে—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভঙ্গুরতা। মাথাপিছু আয়ের কথা আমরা বলছি, সেটা এক হাজার ডলার বা সামান্য বেশি, এটা বিরাট কিছু নয়। এটা কিন্তু গড় আয়—অনেকের আয় এর চেয়ে বেশি আছে বা কমও আছে। কিন্তু অনেক দেশ আছে, মাথাপিছু আয় নিয়ে অনেক কথা বলে, তারা দিনের পর দিন ওয়ার্কশপ করে। তারা সেটাকে স্ট্যান্ডবাইও রাখতে পারে। এটা তো আর দেশের বা জীবনের মানোন্নয়ন নির্দেশ করে না। কারণ এটার সঙ্গে অনেক কিছু যুক্ত আছে, ট্র্যাপও আছে—কারণ এখানে শিক্ষা আছে, স্বাস্থ্য ও নিউট্রিশন আছে। উন্নয়নশীল দেশের আরো একটা শর্ত হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন—আমাদের বিশাল একটা শ্রেণি আছে শিক্ষিত, তাদের যথাযথ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সেটা তো একটা জটিল প্রক্রিয়া। আমাদের কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আছে, তারাও যে কর্মসংস্থানে বিশেষ ভূমিকা রাখছে তা নয় কিংবা বলা যেতে পারে যথেষ্ট নয়। দেশের বাইরে লোক পাঠাতে হচ্ছে। আর ভঙ্গুরতা আমাদের দেশে এখন নেই। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা যা দেখছি, এনজিও, তারপর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যে অবস্থা—সেসব খুব একটা ভালো অবস্থায় আছে তা নয়। আরেকটি বড় সমস্যা আমি দেখছি, বিশ্বের প্রায় ৪০টির মতো দেশে আমাদের বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা আছে। উন্নয়নশীল দেশের কার্যক্রম শুরু হলে সেগুলো কমে আসবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া অন্য কোনো কিছু তো নেই তেমন, যা আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। এগুলোও এক ধরনের সমস্যা বটে। এটা যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। এই সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে যে চাপ তৈরি হবে, সেসব মোকাবেলা করার ক্যাপাসিটি ডেভেলপ করতে হবে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের যে জীবনমান ও এগিয়ে যাওয়া, এগিয়ে থাকা—সেসব ধরার বা রপ্ত করার ক্ষেত্রে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এটা সময়ের দাবি এবং ডিমান্ডও করে। কিছু বিষয়ে উদ্যমী ও দৌড়ঝাঁপ বাড়বে। আর একটা ব্যাপার আছে—ট্রানজেকশন, স্বল্পহারে বাইরে থেকে টাকা আনতে পারব কি না—সেটা তো কমে যাবে। এই বিষয়গুলো ভালোমতো খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে সমাজে মানুষের জীবনযাপনের যে মানোন্নয়ন, মানে ফলপ্রসূ উন্নয়ন, সেখানে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কাজেই উন্নয়ন তখন কোনো কাজে লাগবে না।

উন্নয়নশীল দেশের সূচনাটা সাধারণ মানুষের জীবনে খুব একটা প্রভাব বা পরিবর্তন আনবে, সেটা আমি মনে করি না। তবে হতে পারে যে এটা একটা সাময়িক তুষ্টি আর কি। প্রত্যক্ষভাবে দরিদ্র মানুষের কোনো লাভ বাহ্যিকভাবে দেখা যাবে না। সমাজের উঁচু স্তরে যারা আছে, যাদের ব্যবসা আছে, লিংক আছে তাদের কিছু লাভ হবে ইমিডিয়েটলি। কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের যে অবস্থা—দারিদ্র্য, দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও বিনিয়োগব্যবস্থা; সামাজিক বিষয়গুলো স্বাস্থ্য, নিউট্রিশন—এগুলোর চট করে উন্নতি হবে, তা আমি আপাতত মনে করি না। এ ক্ষেত্রে আমি উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। শিগগিরই সাধারণ মানুষের কোনো উন্নয়ন হবে, সেই আশা আপাতত বলা যাচ্ছে না। তবে এটা উৎসবের একটা সামান্য উপাদান হতে পারে, যা মানুষকে কিছুটা আত্মতৃপ্তি দেবে। এর বেশি কিছু নয়। প্রত্যক্ষ কোনো উপকারে আসবে না, হয়তো পরোক্ষভাবে কোনো উপকারে আসতে পারে।

আরেকটা বিষয়, এই যে উন্নয়নশীলতার পথে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া, এখানে রাজনীতিরও কিছুটা ভূমিকা আছে। তবে সেটাও প্রত্যক্ষভাবে নয়, পরোক্ষভাবে। এই উন্নয়ন রাজনৈতিক সরকারের ধারাবাহিকতা ও গণতন্ত্র আসার ফলেই সম্ভব হয়েছে, সেটাও স্বীকার করে নিতে হয়। কাজেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে গণতন্ত্র ও গুড গভর্ন্যান্সের খুব দরকার। এটারও ধারাবাহিকতা রক্ষা করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি। এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনীতির গুরুত্ব যেমন আছে, এটা নিয়েও তর্ক আছে, জটিলতা আছে। জনগণের অংশীদারিমূলক এবং প্রতিনিধিত্ব করার যে রাজনীতি ও সরকার—সেটা তো সমালোচিত হলে হয় না। জনগণের নির্বাচিত সরকার দরকার।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে আমি আনন্দের খবর হিসেবেই গ্রহণ করতে চাই। একজন অর্থনীতির কর্মী হিসেবে মানুষকে পজিটিভ বিষয়রূপে এটাকে বিবেচনা করতে বলি। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে এটা বাহ্যিকভাবে এখনই কোনো সুফল দেবে না। আমাদের প্রতিদিনের কাজ ও স্বপ্নগুলো নষ্ট করা বা ছেড়ে দিলে কাজ হবে না। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার যে লড়াই ও প্রচেষ্টা সেখান থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। কাজেই এখন আর কাজ না করলেও চলবে বা কোনো প্রচেষ্টার দরকার নেই—এমনটা ভাবা ভুল হবে। এটা একটা প্রক্রিয়ার মতো, পুরোপুরি কার্যকর হতে আরো কিছু সময় লাগবে। এতে এখনই দৃশ্যমান কোনো ফলপ্রসূ উন্নয়ন ও সুবিধা কিন্তু দেখা যাবে না। সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো প্রভাব তাই দৃশ্যমান হবে না।

তাই আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। এটাই অনেক কিছু হয়ে গেছে, আমাদের জন্য আর কিছু করার দরকার নেই—এ রকম ভাবলে ক্ষতি হবে এবং এটাকে আমি সমর্থন করি না। যেভাবে আমরা জীবন নির্বাহ করি, কাজ করি, উদ্যম ও প্রচেষ্টা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাই, সেখান থেকে সরে এলে হবে না। কিংবা সেই অবকাশও এখানে নেই। অনুন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে এসেছি, এখন আমাদের কোনো কাজ আর করতে হবে না, উদ্যমেরও কোনো প্রয়োজন নেই—এমনটা ভাবা কোনোভাবেই সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি না। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা ও সংকল্প, সেটা থেকে সরে আসা যাবে না। তাহলে এটা আমাদের সামাজিক জীবনে একটা দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT