মিছিল কেন সাধারণের জন্য ভীতিকর হবে? মিছিল কেন সাধারণের জন্য ভীতিকর হবে? – CTG Journal

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে সীমান্তে বার বার বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা ঘটছে: মন্জু নাইক্ষ্যংছড়িতে স্থল মাইন ধ্বংস করেছে সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দল ফের বাড়লো স্মারক স্বর্ণমুদ্রার দাম ক্রোড়পত্র প্রকাশে নতুন নিয়ম নাইক্ষ্যংছড়িতে শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘বীর বাহাদুর ফাউনন্ডেশনের’ বই ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ আসন্ন শায়দীয় দূর্গা পূজার প্রস্তুতিতে মানিকছড়িতে মতবিনিময় সভা আওয়ামী লীগ কখনও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করে না : ডা. শাহাদাত যমুনায় দ্বিতীয় রেল সেতুর কাজ শুরু নভেম্বরে, ব্যয় বাড়লো দ্বিগুণ মিলগেটে সরবরাহ সংকট, পাইকারীতে রেডি ও ডিও ভোগ্যপণ্যের দামের বড় ফারাক! সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: জিএম কাদের হাটহাজারীতে সরকারি শিশু পরিবারের ২৫’শ বর্গফুট জমি উদ্ধার বেগমগঞ্জের একলাশপুরে বিভিন্ন বাহিনীর ৭ সদস্য আটক
মিছিল কেন সাধারণের জন্য ভীতিকর হবে?

মিছিল কেন সাধারণের জন্য ভীতিকর হবে?

♦ রেজানুর রহমান-

এক দিনের ঘটনা বলি। হাতিরপুল হয়ে ফার্মগেটের দিকে যাব ভাবছি। হঠাৎ দূরে একটা মিছিল নজরে পড়ল। আমাদের দেশে অনেক ধরনের মিছিল বের হয়। দাবি আদায়ের মিছিল। সাফল্য অর্জনের মিছিল। শোকের মিছিল। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর মিছিল হলো বড় বড় রাজনৈতিক দল আহৃত সভা-সমাবেশে যোগদান ও ফেরার মিছিল। এ ধরনের মিছিলে সাধারণত উত্তেজনা বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে মিছিলকারীরা রাস্তাঘাটের সাধারণ মানুষকে মানুষই মনে করে না। হঠাৎ হয়তো মিছিলের সামনে সাধারণ মানুষ, গাড়ি অথবা রিকশা পড়ে গেছে, মিছিলকারীরা তখন ভয়ংকর আচরণে হৈচৈ শুরু করে দেয়। ভাবটা এমন, ‘অয় ব্যাটা দেখিস না মিছিল যায়! ভাগ, ভাগ… এখান থাইক্যা…

দূরের মিছিলটা এ রকমই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। রাস্তার দুই পাশেই সাধারণ মানুষ বেশ তটস্থ। ভালোয় ভালোয় মিছিলটা চলে যাক—এই ভাবনায় অনেকেই যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। বিরাট এক জনসভায় যোগ দেবে মিছিলটি। সামনে ভ্যানগাড়ির ওপর বেশ বড় দুটি সাউন্ড বক্স বসানো। বেশ করে বিদেশি অর্থাৎ চটুল হিন্দি গান বাজছে। আর সেই গানের তালে তালে মিছিলকারীরা নাচতে নাচতে সামনের দিকে যাচ্ছে। আমার পাশে আরো অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। তিনি বোধ করি নিজেই নিজেকে শুনিয়ে বললেন, ওরা উৎসব করতে যাইতেছে। কিন্তু গানটা যদি বাংলা হইত, ক্ষতি কি হইত!

মিছিল চলে গেছে। কিন্তু আতঙ্ক তখনো কমেনি। পরিস্থিতি আঁচ করতে না পেরে একটি রিকশা ঢুকে গিয়েছিল মিছিলের সামনে। মিছিলকারীদের চোখ রাঙানি থেকে রেহাই পায়নি। ভাঙা রিকশার সামনে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে অসহায় রিকশাওয়ালা। পথচারী অনেকেই তাকে সান্ত্বনা জানাচ্ছে। মিছিলকারীদের উদ্দেশে বিরক্তিও প্রকাশ করছে কেউ কেউ। চোখের সামনে তখনো ভাসছিল মিছিলকারীদের মুখ। চটুল হিন্দি গানটির সঙ্গে অশোভন নৃত্যভঙ্গি করতে করতে সামনের দিকে যাচ্ছে অনেকে। আবার কেউ কেউ পথচারী ও সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে, অ্যাই সইর্যা যান… সইর্যা যান… পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, মিছিলকারীরা যে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে রাস্তায় নেমেছে তারা কি রাজনৈতিক দলটি সম্পর্কে ভালো করে জানে? জানলে বোধ করি মিছিলের চিত্র এতটা অশোভন হতো না। এই যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিলে এত কিশোর, তরুণের অংশগ্রহণ দেখছি, মিছিলে নামার আগে এরা কি সঠিক কোনো দিকনির্দেশনা পায়? মিছিলে কী করা যাবে, কী করা যাবে না, এ ব্যাপারে তাদের কি আদৌ বোঝানো হয়? বোধ করি না। তাদের কিছুই বোঝানো হয় না। হয়তো শুধুই বলা হয়, আজ বড় মিছিল হবে, বড় মিছিল। বড় মিছিল মানেই বড় ক্ষমতা…

৭ই মার্চ বাংলামোটরসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে একদল মিছিলকারীর হাতে কয়েকজন তরুণী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় আবারও একই প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিল। মিছিলকারীদের হাতে কয়েকজন তরুণী প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাঁরা রাস্তা পার হওয়ার সময় মিছিলকারীদের সামনে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে মিছিলকারীদের অনেকে হামলে পড়ে তাঁদের ওপর।

লাঞ্ছিত এক তরুণীর ফেসবুক বার্তা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। ওই তরুণী লিখেছেন, “শান্তিনগর মোড়ে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাস পাইলাম না। হেঁটে গেলাম বাংলামোটর। বাংলামোটর যাইতেই মিছিলের হাতে পড়লাম। প্রায় ১৫-২০ জন আমাকে ঘিরে দাঁড়াইল… ব্যস, যা হওয়ার থাকে তাই… কলেজ ড্রেস পরা একটা মেয়েকে হ্যারেস করতেছে। এটা কেউ কেউ ভিডিও করার চেষ্টা করতেছে। কেউ ছবি তোলার চেষ্টা করতেছে। আমার কলেজ ড্রেসের বোতাম ছিঁড়ে গেছে। ওড়নার জায়গাটা খুলে ঝুলতেছে… ওরা আমাকে থাপড়াইছে, আমার শরীরে হাত দিছে… আমার দুইটা হাত এতগুলা হাত থেকে নিজের শরীরটাকে বাঁচাইতে পারে নাই। একটা পুলিশ অফিসার এই মলেস্টিক চক্রে ঢুকে আমাকে বের করে একটা বাস থামিয়ে আমাকে তুলে দেয়। বাকিটা পথ সেফলি আসছি। শরীরে ব্যথা ছাড়া আর কোনো কাটাছেঁড়া নাই। মেন্টাল ভয়াবহ বিপর্যস্ত। বাট শারীরিকভাবে ভালো আছি। আমি… এই দেশে থাকব না… থাকব না… থাকব না…”

ভাবুন তো একবার, কী মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ওই তরুণী। এই দেশে থাকব না, থাকব না… থাকব না…

জানি না আমার এই কথা সংশ্লিষ্ট কতজন বিশ্বাস করবেন অথবা গুরুত্ব দেবেন। তবুও বলি। মিছিল, সমাবেশ ও রাজনৈতিক আন্দোলন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি দেশের মেধাবী তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি অশিক্ষিত, অপরাধপ্রবণ তরুণদের অংশগ্রহণ রাজনীতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে এমন অনেক তরুণ জড়িয়ে যাচ্ছে যাদের মূল কাজ লেখাপড়া নয়। রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান করা, জনপ্রিয় নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে সেলফি তুলে এলাকায় প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখানোই তাদের কাজ। এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা তাঁদের দল ভারী করার জন্য এসব বিপথগামী তরুণদের দলে ভেড়ান। ওরা পছন্দের নেতার নামে স্লোগান দেয় বিনিময়ে নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। এলাকায় দোকানদার ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা তোলে। ওরা সাধারণ মানুষকে মানুষই মনে করে না।

৭ই মার্চ ঢাকা শহরে মিছিলকারী কর্তৃক একাধিক তরুণী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী আশ্বাস মিলেছে যে অচিরেই হয়তো ন্যক্কারজনক এই ঘটনায় দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পাবে। কিন্তু সভা-সমাবেশ ও মিছিলে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের আচরণগত পার্থক্য কি দেখতে পাব আমরা? রাজনৈতিক দলের মিছিল কেন সাধারণ মানুষের জন্য ভীতিকর হবে? কেন…?

লেখক : নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, আনন্দ আলো

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT