তামাকের আগ্রাসন পরিবেশ ধ্বংশ তামাকের আগ্রাসন পরিবেশ ধ্বংশ – CTG Journal

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:৪৩ অপরাহ্ন

        English
শিরোনাম :
শুক্রবার চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত ৮১ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রফিক উল হকের অবদান অনস্বীকার্য স্থল নিম্নচাপ দেশের মধ্যাঞ্চলে, আজও হতে পারে ভারী বৃষ্টি ব্যারিস্টার রফিক উল হক আর নেই আকবরশাহ’তে ছুরি চাপাতিসহ ২ যুবক গ্রেফতার ফেনীতে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেফতার ১ মানিকছড়ি পূজামন্ডবে দুশতাধিক গরীব দুঃস্থর মাঝে বস্ত্র বিতরণ নিম্নচাপ উপকূল অতিক্রম করেছে, সকালে আবহাওয়ার উন্নতি হতে পারে ফাঁদে ফেলে ১৩ বছর ধরে ধর্ষণের অভিযোগ জেলা পরিষদের শিক্ষাবৃত্তি পেল ৩২৪ শিক্ষার্থী সংকটাপন্ন অবস্থাতেই ব্যারিস্টার রফিক উল হক সাজেক মসজিদ-রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের একটি জনবান্ধব প্রকল্প
তামাকের আগ্রাসন পরিবেশ ধ্বংশ

তামাকের আগ্রাসন পরিবেশ ধ্বংশ

থানছি (বান্দরবান) প্রতিনিধি || থানছি উপজেলা পাহাড়ের সমতল ভূমি ও নদী তীরবর্তী ফসলি জমিতে চলছে তামাকের আবাদ। এতে বিনষ্ট হচ্ছে খাদ্য শস্য উৎপাদন। অতীতে পার্বত্য অঞ্চলে সবচেয়ে দুর্গম ও পিছিঁয়ে পড়ার উপজেলা হচ্ছে থানছি। তবে তখনকাল খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ থাকলেও বর্তমানে সবজিসহ নানা রকম কৃষি পণ্য সমতলের বিভিন্ন জেলা থেকে আমদানি করতে হয়।বান্দরবানে থানছি,লামা ও রুমা উপজেলায় সাংগু নদীর তীরবর্তী কৃষি জমি, সমতল ভূমিতে সর্বত্র তামাকের আগ্রাসন। তামাক উৎপাদন দেশের বিভিন্ন জেলায় উৎপাদন হলেও বান্দরবানে পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি উপজেলায় এর চাষাবাদ আশাংকাজনকভাবে বেড়েছে। আবার তাও মধ্যে থানছি উপজেলা অন্যতম শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত। এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি তামাকের চাষ হয়।

বিগত এক দশক ধরে পাহাড়ে বেড়েছে তামাকের আবাদ। অতি মুনাফা এবং তামাক কোম্পানির নানা প্রলোভনে পড়ে তামাক চাষে ঝুঁকছে কৃষক। এতে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট, খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি, জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস এবং তামাক চাষীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশংকা তৈরি হয়। অতীতে পাহাড়ে তামাক আবাদ কম থাকলেও বর্তমানে চাষের জমির পরিমান অনেক বেড়েছে। যেখানে ৯০ শতাংশ কৃষক জুম করত, সেই জুমিয়া বা সাধারণ কৃষকদের প্রায় ৮০ শতাংশই বর্তমানে তামাকের আবাদ করছে। যার অধিকাংশই ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর আর আবুল খায়ের  চুক্তিবদ্ধ কৃষক। কোম্পানি নানাবিধ সুবিধার মাধ্যমে কৃষকরা তামাক চাষে আকৃষ্ট হচ্ছে। উপজেলার প্রায় পাঁচ’শ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে।

এছাড়া নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহে সবচেয়ে বেশি তামাকের আগ্রাসনের শিকার। এছাড়া তামাকের চুল্লিতে পাতা শোধনের জন্য ব্যবহার করছে বনের বিভিন্ন প্রজাতি ছোট,বড় কাঠ। বিলুপ্ত পথে পরিবেশ।অনুসন্ধানে দেখা গেছে,থানছিতে  তামাক চাষের নেপথ্যে রয়েছে ব্রিটিশ আমেরিক্যান টোবাকো। প্রায় ৮০ শতাংশ তামাকের এর ক্রেতা এই কোম্পানি। এছাড়া অন্যান্য কোম্পানি তামাকের আবাদ শুরু করেছে।

উপজেলার বলিপাড়া,থানছি সদর এলাকা,বড় মদক রির্জাব এলাকা থেকে শুরু করে সাংঙ্গু  নদী সংলগ্ন রুমা উপজেলা গালেনগ্যা ও বাসাদং এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যেকটি এলাকা জুড়ে কৃষি জমিতে দেদারে চলছে তামাকের আবাদ। এসব জমিতে এক সময় শীতকালীন সবজিসহ নানা রকম ফসল উৎপাদন হলেও সেসব জমি বর্তমানে তামাকের দখলে। বাংলাদেশ ব্যাংক তামাক চাষীদের অনুৎসাহিত করতে ঋণ প্রদান না করলেও তামাকের কোম্পানিগুলো কৃষকদের ঋণ, সার, বীজ, কীটনাশক সুবিধা দিচ্ছে। এছাড়া তামাকের আবাদ লাভজনক এবং উৎপাদিত তামাক কোম্পনিগুলো কিনে নেওয়া বিপণন প্রক্রিয়া ঝামেলাহীন। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তামাকের চারা উৎপাদন শুরু হয়। অক্টোবর-নভেম্বর চারা রোপণ করা শুরু হয় এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তামাকের পাতা তোলা শুরু হয়। তামাকের পাতা চুল্লিতে দিয়ে শোধন বা কিউরিং করা হয়। সনাতন পদ্ধতিতে তামাকের চুল্লি বানিয়ে তাঁতে বনের প্রচুর  কাঠ পুড়িয়ে পাতা শোধন করা হয়। এতে বিপুল বনের কাঠ নষ্ট হয়। একটি চুল্লিতে মৌসুমে  শত শত মণ নির্বিচারে কাঠ পোড়ানো হয়।অনুসংন্ধানে আরো জানা যায়,ব্রিটিস আমেরিকা ট্যোবাকো কোম্পানী রেজিস্টারকৃত চাষী ২৮০ জনে উপরে আর ঢাকা ট্যোবাকো ২৫০ জনে প্রায়। কৃষকদের তথ্য মতে জানা যায়,মৌসুমে এক চুল্লিতে বনের কাঠ প্রয়োজন হয় ৩৫-৪০ মন, একজন চাষী যদি ১৫ চুল্লিতে ৩৫০ মণ কাঠ ব্যবহার করলে পুরো মৌসুমে একজন চাষী কাঠ ব্যবহার এসে দাড়াঁয় ৫২৫ মণ বনের কাঠ ব্যবহার করা হয়,আর এদিকে সব মিলিয়ে পুরো মৌসুমে হিসেব করলে দেখা যায় ২৭৮২৫০ মণ কাঠ ব্যবহার করা হয়।

তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ে জুমিয়া ও সাধারণ কৃষকদের জীবন ধারা ও শস্য উৎপাদনে পরিবর্তন এসেছে। এক সময় জুমে ৩২ রকমের সবজি উৎপাদন হত কিন্তু বর্তমানে জুমে নিজের প্রয়োজনীয় শস্য উৎপাদন করে। তামাক অর্থকরী ফসল হওয়ায় জুমিয়া ঐতিহ্যবাহী জুম চাষে অনভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অতীতে পাহাড়িদের বাজার থেকে তেমন সবজিসহ কৃষিজ পণ্য কিনতে হত না। কিন্তু বর্তমানে খাদ্য শস্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় তামাক বিক্রির টাকা দিয়ে খাদ্য শস্য কিনতে হয়। জুমের চাষ কমে যাওয়ায়, জুম ফসলের মাতৃবীজও বিলুপ্ত হচ্ছে।

অনেক কৃষক বলেন,জমিতে তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা কমে যায়, মাটিতে কেঁচোসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর সংখ্যা কমে আসে, জমির মাটি শক্ত হয়ে যায় এবং তামাকের জমিতে পরবর্তীতে ফসলের উৎপাদন কমে যায়।পাশাপাশি তামাকের বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহারে কারণে ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন অসুখে ভোগছে। প্রাপ্ত বয়স্কক্ষেত্রে ও চোখের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়,ঠিকমত খাবার ক্ষেতে ইচ্ছে হয় না,চুল্লিতে যখন আগুন দেয় সে ধুয়া ছড়িয়ে পরে বিভিন্ন দিকে আর রোগাক্রান্ত হয় বাচ্চাদের।

তামাক চাষে আর্থিকভাবে সাময়িক লাভবান হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব থাকে দীর্ঘমেয়াদি। এক বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘একজন তামাক চাষির গড় আয়ু মাত্র ৫৫ বছর, যা অন্য চাষির তুলনায় প্রায় ১১ (এগার) বছর কম। এছাড়া তামাক চাষ ও তামাকের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানিসহ নানা রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয়।

তামাক চাষে কৃষি, বন ও জনস্বাস্থ্যে ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও সরকারকে বিপুল কর দেওয়ায় তা বন্ধ বা নিষিদ্ধ করা যাচ্ছে না। তবে তামাকের কারণে কৃষিতে যে প্রভাব পড়ছে তাতে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT