সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সাফল্য কোথায় - CTG Journal সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সাফল্য কোথায় - CTG Journal

সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে আরও দুই ডজন হেফাজত নেতা আবারও চিকিৎসক দম্পতিকে জরিমানা ভার্চুয়াল কোর্টে জামিন পেয়ে কারামুক্ত ৯ হাজার আসামি লকডাউনের পঞ্চম দিনে ১০ ম্যাজিস্ট্রেটের ২৪ মামলা ওমানের সড়কে প্রাণ গেলো তিন প্রবাসীর, তারা রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা একই কেন্দ্রে টিকা না নিলে সার্টিফিকেট মিলবে না মামুনুলের বিরুদ্ধে অর্ধশত মামলা, সহসাই মিলছে না মুক্তি ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট পেতে সৌদি প্রবাসীদের বিশৃঙ্খলা সেরে ওঠা কোভিড রোগীদের জন্য কি ভ্যাকসিনের এক ডোজই যথেষ্ট? মানিকছড়িতে ভিজিডি’র চাল বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ নিরাপদ কৌশল লকডাউন: স্বাস্থ্য অধিদফতর ৩৬ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেবেন প্রধানমন্ত্রী
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সাফল্য কোথায়

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সাফল্য কোথায়

♦ গাজীউল হাসান খান-

একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি। সে যুদ্ধকে আমরা সবাই বলি মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে ছিল সে মুক্তিযুদ্ধ? একাত্তর-পূর্ববর্তী এ অঞ্চলের (পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা) মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। সে অধিকার শুধু জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু মানুষের রাষ্ট্র শাসনের অধিকার নয়, সে অধিকার ছিল এ অঞ্চলের মানুষের মৌলিক অধিকার। সে অধিকার ছিল গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার। আমাদের সংগ্রাম ছিল যাবতীয় অন্যায়, শোষণ ও অপশাসন থেকে মুক্তির। প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে তার যোগ্য আসন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা বাঙালিরা প্রতিবাদ জনিয়েছি। বারবার প্রতিরোধের আন্দোলন গড়ে তুলেছি। বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছি। অর্থনৈতিক ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছি। সংগ্রাম করেছি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকে আমরা পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলাম, সেখানে হাজার মাইল দূরত্বের পূর্বাঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষের অধিকার নিয়ে করা হয়েছে নিদারুণ প্রতারণা। করা হয়েছে প্রবঞ্চনা। এ যেন এক পরাধীনতার অবসানের পর আরেক ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নিগড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া। ভিনদেশি শাসক কিংবা বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ের পর আরেক তথাকথিত দেশীয় শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটা। যে অপশক্তির শাসন, শোষণ ও প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, তাদের প্রতি অহেতুক প্রীতি কিংবা আনুগত্য প্রকাশ, আমাদের আজকের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বেরই বরখেলাপ। ধর্মের নামে কারো প্রতি ভিত্তিহীন কিংবা অহেতুক সহমর্মিতা, সমর্থন ও সাহচর্য প্রকাশ, ন্যায়-নীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি একরকম স্ববিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। শোষক, শাসক, প্রবঞ্চনাকারী ও মিথ্যাশ্রয়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে ধর্মের কোনো আদর্শ কিংবা যুক্তিগ্রাহ্য সম্পর্ক থাকতে পারে না। সেটা ন্যায়ের ধর্ম ইসলাম কিংবা জনগণের অন্য যেকোনো ধর্মবিশ্বাসই হোক না কেন? রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা একটি অত্যন্ত বিগর্হিত কাজ। যারা সজ্ঞানে এ অপকর্মটি করে তারা আসলে প্রতারক ও প্রবঞ্চক। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিহার করে সর্বক্ষেত্রে ন্যায় ও সুবিচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের যাবতীয় সংগ্রাম, দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও তিতিক্ষা এবং বিশেষ করে স্বাধীনতার স্বপ্ন বিপন্ন হয়ে পড়বে, ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ধর্মীয় ন্যায়নিষ্ঠা ও শুদ্ধাচারও থাকবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা প্রকৃতপক্ষে কী, তা উপলব্ধি করতে কিংবা তাকে আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হলে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। খাটো হয়ে যাবে এ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এ অঞ্চলের সাধারণ খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কোনো ভূস্বামী, শিল্পপতি, পুঁজিপতি কিংবা শোষণ-শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক অপশক্তি প্রাণ দেয়নি। প্রাণ দিয়েছে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক ও অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের সন্তান-সন্ততি এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী হাতে গোনা কিছু নেতাকর্মী। অথচ যে অপশক্তির কথা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তারাই এখন স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং ক্ষেত্র বিশেষে রাজনৈতিক শক্তির আধারে পরিণত হয়েছে। গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যানের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে আমাদের স্বাধীনতার গত প্রায় ৪৭ বছরে এ দেশে সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে অতি সামান্যই। আর অন্যদিকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু নীতিজ্ঞান ও আদর্শহীন মানুষ। যাদের কাছে আমাদের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো মূল্য নেই। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে—স্বাধীনতা তাদের অবাধ লুটপাটের এক অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আর পাকিস্তানি অপশক্তি কিংবা অন্য কোনো প্রতিপক্ষ নেই। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ী এবং এক শ্রেণির আদর্শবিহীন রাজনীতিকের মধ্যে বিভিন্ন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা সরকারের পক্ষেও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। অতীতে শাসকদের অনেকে নিজেরাই বিভিন্ন অসাধু কার্যক্রম ও লুটপাটের বিভিন্ন হাতিয়ারকে শাণিত করেছে জনগণ বা সাধারণ মানুষকে শোষণের জন্য। মাহে রমজানে অর্থাৎ ধর্মীয়ভাবে কৃচ্ছ্র সাধনের মাসেও সে অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণকারীরা তাদের লভ্যাংশ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীর মূল্য বাড়িয়ে দেয় নিদারুণভাবে। বিদেশ থেকে আমদানি ও রপ্তানিকালীন বিভিন্ন অসাধু পন্থা ও ছলচাতুরীর মাধ্যমে দেশকে বঞ্চিত করে তার কাঙ্ক্ষিত উপার্জন থেকে।

বিগত চার বছরে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে। বিদেশে পাচার হয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থসম্পদ। এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায়? ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের সঙ্গে এদের ব্যতিক্রম কী?

সমাজ এবং বৃহত্তরভাবে রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি এখন বাংলাদেশকে কুরে কুরে খাচ্ছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির সে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে না এমন নয়। বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গ্রামগঞ্জ থেকে রাজধানীর দুর্ভেদ্য দুর্গগুলোতে যে ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে, মানুষ তার কমবেশি জানতে পারে। ছোট ছোট হাট-বাজার থেকে বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য, পুলিশ থেকে অন্যান্য সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনে যে ধরনের দুর্নীতি চলছে, তা আর বেশিদিন অব্যাহত থাকলে আমাদের সব অর্জন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাফল্য ম্লান হয়ে যাবে। স্বাধীনতার সুফল অর্থাৎ অর্থনৈতিক মুক্তি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। একদলীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অভাবে আরো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে রাজনীতির ভেতরের ও বাইরের দুর্নীতিগ্রস্ত অশুভ শক্তি। মানুষের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারলে দুর্নীতিকে অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব হয়। প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় জবাবদিহি ও সুশাসন। সে কারণেই এখন গণমাধ্যম থেকে বলা হয়ে থাকে, উন্নয়ন কখনোই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাবে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনাচার উচ্ছেদ করা কখনোই সম্ভব হবে না। সে জন্য সর্বস্তরে চাই দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। আর তার একমাত্র উপায় হচ্ছে মানুষের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। নতুবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি চলবে উন্নত ও শক্তিশালী দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, যা একসময় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কিংবা দাবিকে সামনে নিয়ে আসবে। সে অবস্থাকে তখন সাম্যবাদী কিংবা মৌলবাদী অপতৎপরতা বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। দুর্নীতিবাজ তথা শোষকগোষ্ঠীকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা না গেলেও তাদের দৌরাত্ম্যকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। নতুবা ঝড়ের আশঙ্কা দেখে উটপাখির মতো বালুর স্তূপে মাথা গুঁজে রাখলে নৈরাজ্য ও তাণ্ডব আমাদের ছেড়ে দেবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির শুধু একটি ঘোষণা থেকে আসেনি, ৯ মাসের সশস্ত্র লড়াই এবং অগণিত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ স্বাধীনতা। সুতরাং আর বেশিদিন দেশের সাধারণ মানুষ দেশে বিরাজমান অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, মুনাফাখোরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে রক্তশোষণ এবং কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক আধিপত্যকেই মেনে নেবে না। সেটা যেকোনো রাজনৈতিক মহল বা গোষ্ঠীই হোক না কেন। এটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের মূল শিক্ষা। কোনো এক কবি বলেছেন, ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারোর দানে পাওয়া নয়।’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিফলে গেলে স্বাধীনতার স্বপ্ন ব্যর্থ হবে।

আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী হাতে গোনা আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই উদ্যাপিত হবে। স্বাধীনতার গত ৪৭ বছরে কৃষি, শিল্প, জ্বালানি, শিক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন কম নয়। তবে ব্যর্থতাও কম নয়। আমরা এ দেশটিকে এখনো মানবাধিকারসম্পন্ন একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারিনি। পারিনি আইনের শাসন কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে। গোড়া থেকেই এ দেশে চলে এসেছে এক অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। এখানে কেউ কাউকে যেন আইনের শাসন কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে দিতে চায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, তাও যেন অনেকে চায় না। কেউ কেউ সব সময় একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা লাগিয়ে রাখতে চায়। চায় আরো ধ্বংস, আরো রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা। এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাফল্যের ব্যাপারে তারা কতটুকু বিশ্বাসী, কতটুকু অনুগত, এ কথা বলা দুঃসাধ্য। তবে এটা চলতে দেওয়া যেতে পারে না। এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস, আনুগত্য ও একাত্মতা প্রকাশ ছাড়া কারোরই এ দেশে বাস করা ও রাজনীতি করা উচিত নয়। সে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার তাদের নেই। আবার অগণতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার মতো আধিপত্যবাদী মনোভাবকেও এ দেশের মানুষ অতীতে বেশিদিন বরদাশত করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। সুতরাং এ দেশকে তার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য কিংবা লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে হলে চাই আপামর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। নতুবা উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হবে এবং সে উন্নয়ন উন্নত মান ও মূল্যবোধসম্পন্ন উত্কৃষ্ট মানুষ সৃষ্টি বা মানবসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হবে। তা কোনোমতেই টেকসই হবে না বা স্থায়িত্ব লাভ করবে না। গণতান্ত্রিক শক্তিতে বলীয়ান হয়েই দেশের সব অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে হবে। তাদের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে আইন ও শৃঙ্খলাবোধ, দেশপ্রেম ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। নতুবা দেশব্যাপী অরাজকতা, স্বেচ্ছাচার, নৈরাজ্য ও সামাজিক অনাচার আরো দীর্ঘায়িতই হবে। উন্নয়নের সুফল সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছবে না।

দারিদ্র্য ও অশিক্ষা মানুষকে সর্বাঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত করে না। সে ক্ষেত্রে বহু অর্থবিত্তের অধিকারী শিক্ষিত মানুষকেও দেখা গেছে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে সব মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলতে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক অর্থে ব্যর্থ হয়েছেন দেশের আপামর মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটাতে। আদর্শ, ন্যায়নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটাতে। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই দেখা গেছে একটি তথাকথিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়নিষ্ঠা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যাওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। সে চেতনাকে ধরে রাখার জন্য চাই আন্তরিক প্রচেষ্টা, ত্যাগ, শিক্ষা ও রাজনৈতিক উপলব্ধি এবং সচেতনতা। আমরা কি সে শিক্ষা বা অনুশীলন প্রবহমান রাখতে পেরেছি? পারিনি। স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা কোনো কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠীকে রাজনীতিগতভাবে ঠেকানোর জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। আমাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও তা থেকে লব্ধ চেতনার কথা বলি। অথচ মানুষের গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের সুনিশ্চিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি না। একটি আর্থ-সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলি না। লুটপাট, দুর্নীতি, অপশাসন ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে শক্তিশালী আঘাত হানতে পারি না। এ ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের কিসের ভয়? নাকি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে তাঁরা নিজেরাই পরাজিত হয়ে বসে আছেন? দেশের রাজনৈতিক হামলা-মামলার পরিবর্তে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কী পরিমাণ আইনিব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে পরিসংখ্যান নিলেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। দেশের যেকোনো রাজনৈতিক দলকে জনপ্রিয় হতে হলে তাকে মানুষের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসন এবং উপড়ে ফেলতে হবে দুর্নীতির সম্ভাব্য সব শিকড়। নতুবা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ একটি স্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটাবে না।

এ কথা অনস্বীকার্য যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। দৈহিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি। যে কারণে একটি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আমরা সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনার কতটুকু প্রসার ঘটাতে পেরেছে? তার বিশাল কর্মীবাহিনীকে সে শিক্ষায় কিংবা আদর্শে কতটুকু গড়ে তুলতে পেরেছে? রাজনীতিগতভাবে শাসক আওয়ামী লীগ আর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আদর্শনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ এক নয়। স্বাধীনতার আসন্ন সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগকেই তা আর্থ-রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে পর্যালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। তার জন্য কোনো ‘আঁতেল গোষ্ঠীর’ কাছে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মনে করি না। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে দেশে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নয়ন তো হতেই পারত। কিন্তু বিগত নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, আওয়ামী লীগের গত চার বছরে দেশে অভূতপূর্ব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে আজকের মূল প্রশ্ন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি, শোষণমুক্তির অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংস্কার মুক্তি, আইনের শাসন কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার কতটা সাফল্য অর্জন করেছে, খুঁজে দেখতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, gaziulhkhan@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT