সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
রোহিঙ্গা ও আটকে পড়া পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের বোঝা: প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনিসহ মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষার সূচি প্রকাশ দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ পরমাণু শক্তি আমরা শান্তির জন্য ব্যবহার করবো: প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার ধাক্কা সামলানোর শীর্ষে বাংলাদেশ স্কুল শিক্ষার্থীদের শিগগিরই টিকা দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদীয়া দুর্গাপুজা উপলক্ষে কাপ্তাইয়ে মন্দিরে আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেন সেনা জোন রামগড়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পথে কামাল ‘করোনা পরবর্তী পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীল পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা জরুরি’ ৬ ছাত্রের চুল কেটে দেওয়া শিক্ষক কারাগারে জাতীয় পার্টির নতুন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন ১১ নভেম্বর
বিস্ময়, আতঙ্ক এবং ভয়ঙ্কর এক পরিণতি: মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরাজয়

বিস্ময়, আতঙ্ক এবং ভয়ঙ্কর এক পরিণতি: মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরাজয়

এই পরিণতিতে মার্কিন কর্মকর্তারা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক কর্মকর্তাই এ সময় সপ্তাহ শেষের ছুটিতে ছিলেন এবং ধারণা করেছিলেন, পশ্চিমা সরকারগুলো হয়তো আরও কয়েক মাস বা কিছুটা সময় আফগানিস্তানকে দেবে। কিন্তু সে ধারণা ভুলই প্রমাণিত হয়েছিল।ছবি: এপি

আফগানিস্তানের রাজধানী যেদিন তালেবানদের হাতে দখল হয়ে গেলো, সেদিন সবাই বুঝতে পেরেছিল প্রায় ২০ বছর ধরে চলা মার্কিন বাহিনীর অভিযানের ফলাফল হিসেবে আফগান জনগণ কী পেতে চলেছে। দুই দশকের অস্পষ্ট সেই যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফলাফলটি কারো অজানা ছিল না।

রাজধানী দখলের আগের দিন, উত্তরের সবচেয়ে বড় শহর-মাজার-ই-শরীফ, কোন ধরনের শক্ত প্রতিরোধ ছাড়াই তালেবানের কাছে আত্মসমর্পণ করলো। অথচ এই শহরটা আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী শক্তিশালী একটি ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। রাতারাতি ঠিক একই ঘটনা ঘটলো দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার জালালাবাদ শহরে। 

১৫ আগস্ট শহরকে ঘিরে থাকা কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়গুলো ভেদ করে সূর্যের দেখা মিলতে না মিলতেই কাবুল শহরটি পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়ে যায়। মার্কিন সরকারের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এবং হাজার হাজার জীবনের বিনিময়ে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিমেষেই  চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় কাবুলে তালেবানদের প্রবেশের মাধ্যমে। তবে, তখনও আফগান সরকারি বাহিনীর কিছু সদস্য তালেবানদের প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিল। 

আগের সন্ধ্যায় অফিসারদের মাঝে নতুন ইউনিফর্ম বিতরণকারী এক আফগান নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন “সবাই তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। সমস্ত নিরাপত্তা বাহিনীই প্রস্তুত ছিল।”

তিনি অন্তত সেটাই ভেবেছিলেন। সকালে যখন তিনি শহরের প্রধান চেকপয়েন্টগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার কমান্ডার তাকে একটি চেকপয়েন্ট থেকে বিদায় করে দেন। 

সেই কর্মকর্তা জানান, “তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আপাতত এটি ছেড়ে দিন; আপনি কয়েক দিনের মধ্যে এটি আবারও করতে পারেন।”

কিন্তু কাবুলের হাত সময় ছিল না একদমই।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তালেবান যোদ্ধারা সেই চেকপয়েন্টগুলো দখল করে নিয়েছিলো। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো। অথচ প্রাসাদের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনি মার্কিন কর্মকর্তা, এমনকি তার নিজের বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যন্ত আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করেননি। আর এভাবেই আধুনিক ইতিহাসে একাধিক  যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত আফগানিস্তানে এক বিশৃঙ্খল, ধ্বংসাত্মক এবং অবমাননাকর মার্কিন যুগের অবসান ঘটলো।

এই পরিণতিতে মার্কিন কর্মকর্তারা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক কর্মকর্তাই এ সময় সপ্তাহান্তের ছুটিতে ছিলেন, এবং ধারণা করেছিলেন, পশ্চিমা সরকারগুলো হয়তো আরও কয়েক মাস বা কিছুটা সময় আফগানিস্তানকে দেবে। কিন্তু সে ধারণা ভুলই প্রমাণিত হয়েছিল। 

অন্যদিকে, আফগান সরকারি বাহিনী যে এত দ্রুত ভেঙে পড়বে সেটিও কেউ ভাবতে পারেনি। এমনকি তালেবানরাও অবাক হয়েছিল সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধবিহীন এমন পরাজয় মেনে নিতে দেখে।

পরামর্শদাতাদের ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করেই মূলত আফগান রাষ্ট্রপতি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্তে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। এরপরেও, কাবুলে তালেবান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু সেই সুযোগকে আমলে না নিয়ে, বরং বিমানবন্দর দিয়ে তার লোকেদের আফগানিস্তান থেকে বের করে আনাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি  যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে পরিস্থিতি বিবেচনায়।

প্রায় দুই ডজন মার্কিন এবং আফগান কর্মকর্তা, তালেবান কমান্ডার এবং শহরের বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে, কাবুলের পতন এবং আমেরিকার দীর্ঘতম যুদ্ধের চরম পরিণতির এই বিবরণ পশ্চিমা মিডিয়াগুলোয় তুলে ধরা হয়েছে। 

শেষের দিকে, ওয়াশিংটন এবং কাবুল উভয়েই, কাবুল পতনের সম্ভবনা আঁচ করতে পারলেও, কেউই ভাবেনি সেই পতন এতটা দ্রুত গতিতে ঘটবে। প্রায় ৫০ লাখ জনবসতি এবং মার্কিন বাহিনীর স্নায়ুকেন্দ্র কাবুল পতনে অন্তত আরও কিছুদিন সময় পাওয়া যাবে বলেই ধারণা করেছিল সবাই। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন আফগান ও মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, কাবুল দখলের সম্ভবনাকে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

একজন সাবেক আফগান কর্মকর্তার জানান, গনি সবাইকে বলেছিলেন, মার্কিন সৈন্য চলে যাওয়ার পর আফগান বাহিনী তালেবানকে দমন করতে পারবে। পরিস্থিতি সামলে নিতে হয়তো সরকারের মাস ছয়েক সময় প্রয়োজন হবে। এমনকি আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলে এবং প্রাদেশিক রাজধানীতে তালেবান হামলা বাড়তে থাকলেও তার সেই আত্মবিশ্বাস একেবারে অটুট ছিল।

কাবুলের ১৯ শতাব্দীর রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ থেকে  তিনি জোর দিয়েই বলেছিলেন,”আমরা সেখানে যুদ্ধ করছি, তাই আমাদের এখানে যুদ্ধ করতে হবে না।”

কিন্তু মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আফগান সরকার বাহিনী একদমই যুদ্ধ করছে না।

একে একে তালেবানরা সরকারের রাজস্ব আদায়ের পয়েন্টগুলো দখল করতে থাকলেও সরকার বাহিনী থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।  

তবে, তালেবানদের জয়ের মুখে একদম শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি গনির আত্মবিশ্বাস কিছুটা ভাঙতে শুরু হয় বলে জানান মার্কিন বাহিনীর কর্মকর্তারা।

জুলাইয়ের দিকে রাষ্ট্রপতি গনির সঙ্গে এক মিটিং শেষে কর্মকর্তারা সিদ্ধান নেন, ৩৪ টি প্রদেশেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেহেতু কঠিন হয়ে পড়বে, তাই কাবুলের সুরক্ষায় যে প্রদেশগুলো রক্ষা করা জরুরি, সেই প্রদেশগুলোর নিরাপত্তার উপরেই বেশি জোর দিতে হবে।

এক কর্মকর্তা বলেন, “তাদের সেদিকেই নজর দিতে হয়েছিল যা রক্ষা করা তাদের সাধ্যের মধ্যে ছিল। সব প্রদেশই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কাবুলের নিরাপত্তায় কিছু প্রদেশের ভূমিকা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

৬ আগস্ট, দক্ষিণ – পশ্চিমের জারাঞ্জ থেকে শুরু করে যখন পরবর্তী নয় দিনে আরও দুই ডজন প্রাদেশিক রাজধানী তালেবান দখলে চলে যায়, তখন রাষ্ট্রপতি গনি  বিচলিত হয়ে পড়েন।

তবে, কাবুল পতনের আগ মুহূর্তেও শনিবার বিকেল পর্যন্ত, গনি দেশ ছাড়ার বন্দোবস্ত বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনও জরুরী পরামর্শ দেননি।

কাবুল পতনের আগের দিন রাষ্ট্রপতি বাইডেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন, প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন সহ মার্কিন কর্মকর্তাদের অনেকেই  ক্যাম্প ডেভিডে অবকাশ কাটাতে গিয়েছিলেন।

কিন্তু এরমধ্যে শনিবারে, মাজার-ই-শরীফের পতন, তাদেরকে সঙ্কটের গভীরতা উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। তারা বুঝতে পারে এখন লড়াই না করলে সব কিছুই হাত ছাড়া হয়ে যাবে। এ নিয়েও তখন পেন্টাগন এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। 

সেদিন বাইডেন এবং তার শীর্ষ নিরাপত্তা সহকারীদের সঙ্গে একটি সম্মেলন শেষে প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন সকল মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের অবিলম্বে কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থানের আহ্বান জানান।

দূতাবাসের কর্মীরা শুক্রবার থেকে সংবেদনশীল নথি এবং সরঞ্জাম ধ্বংস করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করছিলেন। দূতাবাসের পতাকা বা সংবেদনশীল তথ্য ও সরঞ্জামগুলো যেনো অপব্যবহার না হয় সে জন্য দ্রুতই সেগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

দূতাবাস কর্মকর্তারা বলেছিলেন, মার্কিন কর্মীদের তাদের কাজ শেষ করতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন। কিন্তু অস্টিন জোর দিয়েছিলেন যে, সময় শেষ হয়ে গেছে।

রোববার সকালে কাবুল অধিবাসীদের জন্য এক ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল। আগের রাতে জালালাবাদের পতন রাজধানীকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। শহরের দোকানপাট বন্ধ করে, লোকজন  কাজ থেকে বিরতি নিয়ে বাড়িতেই অবস্থান করছিল। কিন্তু তাদের তখনও ধারণা ছিল না যে কাবুলের পতন এতটাই সন্নিকটে।

তালেবান বাহিনী যখন রাজধানীতে প্রবেশ করে, তখন শহরের বাসিন্দারা বিচ্ছিন্নভাবে ছোটাছুটি করে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বিশেষ করে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজতে লাগলো।

রাষ্ট্রপতির একজন উপদেষ্টার বক্তব্যে জানা যায়, রাষ্ট্রপতিকে বলা হয়েছিল, “আপনি যদি এখানে থাকেন তবে আপনাকে হত্যা করা হবে। হয়তো আপনার প্রাসাদের রক্ষী কিংবা তালেবান, যে কেউই এই কাজ করতে পারে।”

তালেবানরা শেষবারের মতো কাবুল জয় করেছিল ১৯৯৬ সালে। তখন বিজয়ী যোদ্ধারা সাবেক সোভিয়েত সমর্থিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে তার দেহ ঝুলিয়ে রেখেছিল। 

এরপর ঘানি দেশ ছাড়তে রাজি হন।

রাষ্ট্রপতি তার জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন কিন্তু উপদেষ্টারা তাকে বলেছিলেন, হাতে একদম সময় নেই। সেদিন বিকেলে, একজোড়া প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পায়ে এবং পাতলা কোট পরে, রাষ্ট্রপতি ফার্স্ট লেডির সঙ্গে এবং মুষ্টিমেয় শীর্ষ সহযোগীদের নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়েন।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া এক প্রাসাদ কর্মকর্তা বলেন, হেলিকপ্টার উড্ডয়নের সময়ও জানতেন না কোথায় যাচ্ছেন তারা।

অবশেষে, তারা উজবেকিস্তানে অবতরণ করেন। সেখান থেকে আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে উদ্দেশ্যে একটি ছোট বিমানে করে যাত্রা শুরু করেন।

ঘানির চলে যাওয়ার খবর না জেনেই, কিছু উর্ধ্বতন আফগান কর্মকর্তারা সাহায্য চেয়ে রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে বার্তা পাঠাতে থাকেন। কিন্তু সেই বিকেলেই কোনো এক সময়, গনির সচিব বার্তাগুলোর উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেন।

এমনকি গনি এবং তার সহযোগীরা নিরাপত্তায় গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেও, তারা কখনও সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, যারা তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। 

যারা কয়েক বছর ধরে ঘানির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা শিকার হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন । 

কাবুলের সেই ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা, যাকে সকালে চেকপয়েন্টগুলোর শক্তি বৃদ্ধি থেকে বিরত রাখা হয়েছিল, তিনি এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারেন, যে সরকারের জন্য তিনি লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলেন সেই রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। 

খবর পেয়ে তিনি বিমানবন্দরে ছুটে যান। দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎই বিমানবন্দর বিমান শূন্য হয়ে পড়েছিল। 

তিনি বলেন, “প্রত্যেকে একে অপরকে জিজ্ঞেস করছিলো, কি হয়েছে? কি হয়ছে? কি চলছে এখানে?”

তাড়াহুড়ো করে আয়োজিত এক ব্যক্তিগত বৈঠকে, মার্কিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর কমান্ডার ম্যাকেঞ্জি সহ ঊর্ধ্বতন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান আবদুল গনি বারাদারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।

বারাদার সেই আলোচনায় বলেন, “আমাদের একটি বড় সমস্যা আছে। এটি মোকাবেলা করার জন্য আমাদের কাছে দুটি বিকল্প আছে: হয় আপনারা (মার্কিন সামরিক বাহিনী) কাবুল সুরক্ষার দায়িত্ব নিন অথবা এর দায়িত্ব আমাদেকে দিন।”

সারাদিনই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সমস্ত আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে দৃঢ় ছিলেন। আফগান সরকারের পতন তার মন পরিবর্তন করেনি।

ম্যাকেঞ্জি, বারাদারকে বলেছিলেন, মার্কিন মিশনটি কেবলমাত্র মার্কিন নাগরিক, আফগান মিত্র এবং অন্যদের ঝুঁকিতে থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পরিচালিত হবে। আর এর জন্য মার্কিন বাহিনীকে বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হবে।

অন্য দুই মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য মতে, সেই আলোচনায় একটি সমঝোতা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয় তালেবান বাহিনী। তবে, শর্ত ছিল, তালেবানরা পুরো শহরটি নিয়ন্ত্রণ করবে।

তালেবান বাহিনীর তথ্যমতে, তারা সেদিন কাবুল দখল করতে চায়নি। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ঘানির প্রস্থান তদের সেদিনই কাবুল দখলের পথকে সুগম করে দিয়েছিল। 

তালেবান কমান্ডার হাক্কানি, সেদিন সকালে তার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের প্রবেশ পথে পৌঁছে এক অবাক দৃশ্য দেখতে পান।

তিনি বলেন, “আমরা একজন সৈনিক বা পুলিশকেও দেখতে পাইনি।”

তারপরেও কয়েক ঘণ্টা তিনি কাবুল দখলে সামনে এগিয়ে যাননি। কারণ তাকে এমনটাই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

তবে, সরকার পতনের খবর পাওয়ার পর, তিনি এবং তার লোকজন এক ঘণ্টার মধ্যে শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে যান। বিকেল নাগাদ তারা প্রাসাদ দখল করেন।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, আমরা অত্যন্ত খুশি ছিলাম। আমাদের বেশিরভাগ যোদ্ধারাই কাঁদছিল সেদিন। আমরা কখনই ভাবিনি আমরা কাবুলকে এত দ্রুত দখল করতে পারবো”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ পরাজয় ছিল খুবই সুস্পষ্ট। মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো তাদের দূতাবাস কর্মীদের বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়ার কারণে এ পরাজয় পুরো বিশ্বের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

সকল নথিপত্র, যন্ত্রপাতি এবং পতাকা ধ্বংসের কাজ শেষ হওয়ার পর, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই কূটনৈতিক মিশন দেখতে “এক অদ্ভুত জায়গা”-এর মতো লাগছিল। 

এরপর শুরু হয় আফগানিস্তান থেকে ঐতিহাসিক মার্কিন উদ্ধার অভিযান।

আবারও তালেবান শাসনের অন্ধকার যুগ শুরু হওয়ার ভয়ে, রাতের আঁধারেই বিমানবন্দরে বাড়তে থাকে আফগানীদের উপচে পড়া ভিড়।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারা কখনও সেখান থেকে বের হতে পারবে। সেই রাতে বাড়িতে না গিয়ে কাবুলের উর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা তার একজন বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনি তখন থেকেই সেখানে লুকিয়ে আছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দু’দিন আগে বা পরে তালেবানরা তাকে খুঁজে পাবেই এবং তাকে হত্যা করবে।

তিনি বলেন, যেদিন রাষ্ট্রপতি পালিয়ে গেলেন, সেদিনই তার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, “সেই মুহূর্তেই সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি শত শত তালেবানকে হত্যা করেছি। তাই নিশ্চিতভাবেই তারা আমাকে হত্যা করবে।”

  • সূত্র: এমএসএন

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT