বিএনপি এখন মুসলিম লীগ, সত্যি? - CTG Journal বিএনপি এখন মুসলিম লীগ, সত্যি? - CTG Journal

বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ০১:৪২ অপরাহ্ন

        English
বিএনপি এখন মুসলিম লীগ, সত্যি?

বিএনপি এখন মুসলিম লীগ, সত্যি?

প্রকৃত অর্থেই বিএনপি রাজনীতিতে অবস্থান হারাতে বসেছে, নাকি ‘চাপ সৃষ্টি’র মাধ্যমে দলটিকে নির্বাচনে কোনঠাসা করে ফেলা হচ্ছে, তা শুধুমাত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব।বিএনপি’র লোগো

রাজনীতির ময়দান থেকে হারাতে বসেছে বিএনপি। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল বিচারে অন্তত সেটাই মনে হতে পারে। 

জনপ্রিয়তা হারিয়ে এক সময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগকেও রাজনীতির মঞ্চ ছাড়তে হয়েছিল। বছর দুয়েক আগে আওয়ামী সরকারের অন্তত দুজন মন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, মুসলীম লীগের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: সত্যিই কি তাই?

উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে দলটির নির্বাচনী ফলাফল লক্ষ্য করুন।

রোববার পৌরসভা নির্বাচনের পঞ্চম ধাপ অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে চলতে থাকা এই নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচিত ১৮৩ জনই আওয়ামী লীগ মনোনীত। অন্যদিকে, ২৩৩টি পদের মধ্যে মাত্র ১১টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা মেয়র পদে ৩২ আসনে জয়লাভ করেন। শীর্ষ দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এই প্রার্থীরা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের গণনা করা হলে আওয়ামী লীগের সাফল্য আরও বাড়বে। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ের হারও বিএনপির তুলনায় তিন গুণ।

তবে বিএনপির এই দুর্দশা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। পৌরসভা নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে একই চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে ভোটকেন্দ্র দখল করা থেকে শুরু করে সহিংসতা, এমনকি ভোটার ও বিরোধী প্রার্থীদের ভীতি প্রদর্শনের নানা অভিযোগ উঠেছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযোগের তীর ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা ও কর্মীদের দিকে। নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত স্থানীয় প্রশাসন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে গেছে। ২০১৪ সালে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচন বয়কটের পর থেকেই প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রথম ধাপের বিশৃঙ্খলা আমলে নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী ধাপগুলোতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। পৌরসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জয়জয়কার নির্বাচনের প্রথম ধাপের পরেই অনুমান করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঘটেছেও তা-ই।

জানুয়ারির শেষে, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে। চট্টগ্রামেও নির্বাচনী সহিংসতায় ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।

বন্দর নগরীতে আওয়ামী সমর্থক প্রার্থীর কাছে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। দলটি কোনো কাউন্সিলর পদেও জয় লাভ করতে পারেনি। কাউন্সিলরের ৫৫টি পদই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীর নেতাদের দখলে চলে যায়।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রাজনীতি থেকে বিএনপি নির্মূল হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। বিএনপির বর্তমান অবস্থা কি ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যেরই প্রতিফলন?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এই নেতা বিএনপির অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। ওবায়দুল কাদেরের ভবিষ্যদ্বাণী জাতীয় নির্বাচনেই প্রতিফলিত হয়েছিল। বিএনপিকে সেবার এক অপমানজনক পরাজয় বরণ করে নিতে হয়। সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে জয়লাভ করে দলটি। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

নির্বাচনের একদিন পর, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন: ‘বিএনপি কর্মীদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে নির্বাচনে দলটির ভরাডুবি হয়েছে এবং দলটিকে মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করতে হবে।’

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির দুর্ভাগ্যের কেবল সূচনা হয়েছিল। ২০১৪ সালেও দলটি নির্বাচন বয়কট করে। তবে আসলেই কি বিএনপির ভাগ্য মুসলিম লীগের মতো হতে চলেছে?

মুসলিম লীগের উত্থান ও পতনের গল্প সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক।

১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ জনসাধারণের মাঝে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই প্রেক্ষাপটে পরবর্তীকালে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’বছরের মধ্যেই মুসলিম লীগ জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে।

একাধিক শ্রমিক ধর্মঘট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, বিভিন্ন জেলায় কৃষি বিদ্রোহ, পুলিশ বিদ্রোহ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মুল্যবৃদ্ধি, ভাষা নিয়ে অসন্তোষ এবং নতুন রাষ্ট্রের উত্থান ঘিরে নানা সমস্যার কারণে মুসলিম লীগ জনপ্রিয়তা হারায়।

সাধারণ মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তারা বিকল্প নেতৃত্বের অনুসন্ধান শুরু করে। অন্যদিকে, মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক লীগ নেতৃত্ব প্রদানের জন্য প্রস্তুত ছিল। কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে মিলিতভাবে দল দুটি যুক্তফ্রন্ট নামের নির্বাচনী জোট গঠন করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। অন্যদিকে, মুসলিম লীগ মাত্র আটটি আসন পায়। শোচনীয় ওই পরাজয় মুসলিম লীগের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।

মুসলিম লীগের মতো বিএনপিও এক সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা ও মতাদর্শ জনসমর্থন লাভ করেছিল। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারকে অপসারণের পর দলটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দুবার সরকার গঠন করে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচিত হয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।

বিগত কয়েক বছর ধরেই বিএনপির শীর্ষ থেকে প্রান্তিক নেতারা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৩ সালে দলটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে অবস্থান নেয়। সেই আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার কারণে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন রোধে আন্দোলনে নামে দলটি । তবে সেই আন্দোলনও ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, রাজপথে সহিংসতার দায়ে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের হয়। অনেক নেতাকেই সে সময় আটক করে পরবর্তীকালে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। দলীয় প্রধান নেত্রীকে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এক কথায় বললে, দলটি নজিরবিহীন সংকটের মধ্যে পড়ে।

কিন্তু তারপরও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির কফিনে শেষ পেরেকটি পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হবে। তবে সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দলটির শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি এখন আর নজরে পড়ে না।

তবে মুসলিম লীগ ও বিএনপির অবস্থার মধ্যকার তুলনার সহজ সরলীকরণ সম্ভব নয়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় ঘটলেও এর সচ্ছ্বতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছে। ভোটার ও বিরোধী প্রার্থীদের ভীতি প্রদর্শন, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ভরা- এমনতর বিষয় ছিল কল্পনার বাইরে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কী বলছে?

সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই ধরুন। নির্বাচনে দায়িত্বরত প্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার দায়ভার নির্বাচন কমিশনের ওপর ছিল। প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু সব দেখেও নির্বাচন কমিশনের আচরণ ছিল উটপাখির মতো। সমালোচকরা সম্ভবত কমিশনকে বিশাল এক শূন্যের বেশি দিতে রাজি হবেন না।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটে। ওই নির্বাচনসহ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতেও হস্তক্ষেপ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

আর তাই সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির ফলাফল ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার অন্তর্নিহিত অর্থ কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা আওয়ামী প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ জয়ের আলোচনার চেয়েও অধিক জরুরি।

প্রকৃত অর্থেই বিএনপি রাজনীতিতে অবস্থান হারাতে বসেছে, নাকি ‘চাপ সৃষ্টি’র মাধ্যমে দলটিকে নির্বাচনে কোনঠাসা করে ফেলা হচ্ছে, তা শুধুমাত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব।


  • লেখক: উপ-নির্বাহী সম্পাদক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT