রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:১১ অপরাহ্ন

        English
শিরোনাম :
রোহিঙ্গা ও আটকে পড়া পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের বোঝা: প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনিসহ মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষার সূচি প্রকাশ দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ পরমাণু শক্তি আমরা শান্তির জন্য ব্যবহার করবো: প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার ধাক্কা সামলানোর শীর্ষে বাংলাদেশ স্কুল শিক্ষার্থীদের শিগগিরই টিকা দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদীয়া দুর্গাপুজা উপলক্ষে কাপ্তাইয়ে মন্দিরে আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেন সেনা জোন রামগড়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পথে কামাল ‘করোনা পরবর্তী পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীল পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা জরুরি’ ৬ ছাত্রের চুল কেটে দেওয়া শিক্ষক কারাগারে জাতীয় পার্টির নতুন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন ১১ নভেম্বর
বাঙালির ‘শুভ যিশুবর্ষ মুবারক’

বাঙালির ‘শুভ যিশুবর্ষ মুবারক’

♦ দাউদ হায়দার

বাঙালির রসিকতার আগা-পাশতলা নেই। বারো হাত কাঁকুড়ের (বাঙ্গি) তের হাত বিচি কেউ দেখেনি; কিন্তু প্রবাদ, মূলত রসিকতা।
ক্রিকেটার বিরাট আর অভিনেত্রী আনুশকা যুগল হয়ে যায় ‘বিরুশ্কা’। তাই যদি হয়, কলকাতার একজন বলেছেন, ‘চার্লস আর ডায়না’ কি হবে ‘চায়না?’ (চীন)। অভিনেত্রী ক্যাটরিনা (কাইফ) ও মাইকেল ডগলাস (অভিনেতা) বিয়ে করলে কি যুগলকে সম্বোধন করা হবে ‘ক্যাট-ডগ’? হতেও পারে। সবকিছুতেই এখন সংক্ষিপ্তকরণ। কবি মাইকেল মধুসূদন হয়ে যান ‘মধুকবি’। যেমন— ‘মধুকবি’ উৎসব।
রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুলকে নিয়ে অনুষ্ঠানের নামকরণ ‘রসুন’! অনেকে বলেন ‘রসুন উৎসব’। কলকাতার এক দৈনিক খবরের কাগজে দেখেছিলাম, রিপোর্টে উল্লেখিত, ‘রসুন সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন….’।
বলা হয়— শব্দই ‘ব্রহ্ম’। শব্দ মূলত ‘নাদ’। যথা— কলনাদ, বজ্রনাদ, আর্তনাদ। নাদ-এর ধর্মীয় অনুষঙ্গ আছে। বিশদ আলোচনায় যাচ্ছি না।

ভাষার নিজস্ব দেশকাল-সংস্কৃতি-ধর্মবোধ আছে। শব্দেরও আছে।

পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ঢাকায় আসছেন, ১৯৬৮ সালে। মুসলিম লীগের একদল লোক নবাবপুর রোডের রেললাইন (তখন রেললাইন ছিল) থেকে মিছিল নিয়ে পল্টনের দিকে, স্লোগান— ‘খোশ আমদেদ’, অর্থাৎ ‘স্বাগতম’। এই শব্দে প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয়বোধ।

এখন কেউ ‘কমরেড’ বলেন না। একসময় কমরেড বললে নেতা বোঝাত (কমরেড মানে বন্ধু)। বন্ধু-বন্ধুতার দিন বোধহয় শেষ। বাংলাদেশ থেকে ‘কমরেড’ উধাও। বহু কমরেড আজ হাজি, আলহাজ।

ঈদ শেষে লোকে কয় ‘ঈদ মুবারক’। মুবারক অর্থ শুভেচ্ছা। শব্দটি আরবি। যেহেতু আরবি এবং ধর্মের সঙ্গে যুক্ত, ধর্মীয় গন্ধ আছে।

কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান-এ সাপ্তাহিক কলাম লিখতাম একসময়। একটি লেখায় ‘পুজো মুবারক’, ‘বিজয়া মুবারক’ লিখে কিছু পাঠকের গালমন্দ হজম করতে হয়। কিছু পাঠক বাহবাও জানান। এক পক্ষের কথা— শব্দ প্রয়োগে ধর্মকেও সংকর করা হচ্ছে। আরেক পক্ষের যুক্তি— ভাষার সংমিশ্রণ যদি মাধুর্য হয়, কেন গ্রহণীয় নয়?

গ্রহণ-বর্জনের চেয়ে মুখ্য বিষয় শ্রুতিমধুর কিনা। ‘শুরুতেই গলদ’, এই বাক্য অপ্রচলিত। ‘বিসমিল্লায় গলদ’ বলতে চিত্র-ঘটনা পরিষ্কার। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম প্রত্যেকেই বলেন। ‘বিসমিল্লাহ’ ইসলামি শব্দ কিনা— গোঁড়া ব্রাহ্মণও প্রশ্ন তোলেন না।

আসল কথা হলো অচল না প্রচল। ইংরেজি শব্দ ‘হ্যাপি’— সুখ, আনন্দ দুই-ই বোঝায়। কিন্তু ‘হ্যাপি বার্থডে’র বদলে যদি বলা হয় ‘সুখী’ বা ‘আনন্দিত’ জন্মদিন, বোধ করি গোটা জন্মদিনই মাঠে মারা যায়। হ্যাপি নিউ ইয়ার না বলে ‘সুখী/আনন্দিত’ নববর্ষ বললে শ্রুতিকটু। ‘হ্যাপি’র আরেক অর্থ ‘শুভ’। ‘হ্যাপি বার্থডে’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ নিশ্চয় শুভ জন্মদিন, শুভ নববর্ষ হতে পারে। বাংলা নববর্ষে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলবো না, শুভ নববর্ষই সঠিক, বঙ্গীয়।

গত বছর, বার্লিনের নাক উঁচু ‘সাংস্কৃতিক বাঙালি’ আয়োজিত নববর্ষ স্বাগত-অনুষ্ঠানে রাত্রি ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুনি বাঙালিরা সমস্বরে বলছেন— ‘শুভ/স্বাগতম যিশুবর্ষ’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ নয়। ভাষার এই বঙ্গীয়করণে কৌতূহলী হই। ‘খ্রিস্টবর্ষ’ নয়, ‘যিশুবর্ষ’।

যিশুবর্ষ আবাহনের আগে বাঙালি খানা— ডাল, ভাত, সবজি, কষানো বিফ। সঙ্গে পানীয় বিয়ার, ওয়াইন, জিন, হুইস্কি। হাড়কাঁপানো শীতেও বঙ্গীয় নারীর পরনে বাহারি শাড়ির সাজ।

গোপন কথা এই— এসেছেন প্যান্ট-কোট তথা গরম পোশাকে, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন শাড়ি-সালোয়ার কামিজ। অনুষ্ঠান যে প্রেক্ষাগৃহে, হিটিংয়ে প্রেক্ষাগৃহ গরম।

প্রত্যেকের হাতে শ্যাম্পেইনের গ্লাস, ভর্তি। যেই ১২টা বাজলো, নতুন বছরের শুরু, অমনি, গ্লাসে-গ্লাসে ঠোক্কর দিয়ে খ্রিস্টবর্ষের স্বাগতম। এও বাহ্য। খ্রিস্টবর্ষ-স্বাগতম অনুষ্ঠানে ইংরেজি-জার্মান-বাংলা গান, মিউজিক নয়; সব হিন্দি। হিন্দি-গানে ডিস্কো ড্যান্স। হিন্দি সিনেমায় সেসব গানে ডিস্কো ড্যান্স জমজমাট।

ইউরোপের অন্য দেশের বা উত্তর আমেরিকার কথা বলতে পারব না, বার্লিনের বাঙালি বৌ-মেয়েকূলে বলিউডি ছবির এ টু জেড ঠোঁটস্থ। নায়িকার পোশাক, চালচলন চাহনিও। সেজেগুঁজে, খ্রিস্ট নববর্ষের উছিলায়, মওকা বুঝে বলিউডি নাচ। মন্দ কী! সুখ, আনন্দের কোনও ধর্মীয় দেশকাল নেই।

এ বছর, ৩১ ডিসেম্বরে, ২০১৮ খ্রিস্টবর্ষ আবাহনে বাঙালির যে অনুষ্ঠান-হুল্লোড়, জার্মান বা ইংরেজি ভাষায় নয়, বাংলায় লেখা নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে চমকিত। শিরোনাম: ‘শুভ যিশুবর্ষ মুবারক’।

যিশুও তবে বঙ্গীয় ও ইসলামি!! একেই বোধহয় ‘মাল্টি-ধর্ম, মাল্টি-কালচার’ বলে!

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT