বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে থাকা যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র ৬ জন - CTG Journal বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে থাকা যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র ৬ জন - CTG Journal

শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ১১:১৬ অপরাহ্ন

        English
বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে থাকা যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র ৬ জন

বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে থাকা যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র ৬ জন

সেই ছয় জন মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে একটি ভাষা। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা এই ভাষার নাম রেংমিটচা।ক্রাংসি পাড়ার বাসিন্দা দুই রেংমিটচাভাষী কোনরাও ম্রো (নারী) ও মাংপুং ম্রো।

বান্দরবানে দুর্গম পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর এক গোত্র রয়েছে; যারা নিজের মাতৃভাষা বলতে জানে এমন সদস্য সংখ্যা মাত্র ছয় জন। তাদের অধিকাংশের বয়সও ষাটোর্ধ্ব। আর সেই ছয় জন মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে একটি ভাষা। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা এই ভাষার নাম রেংমিটচা। 

ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো জানান, আমেরিকার এক ভাষা গবেষকের মাধ্যমে জানতে পারি আলীকদম উপজেলার কিছু দুর্গম এলাকায় আমাদের ম্রো জনগোষ্ঠীর এক গোত্র রয়েছে। যাদের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা এবং ভিন্ন সুরে।

”তখন ওই ভাষা গবেষকের সঙ্গে আমি কাজ শুরু করি। রেংমিটচা ভাষাভাষী মানুষদের খুঁজে বের করি। ২০১৩ সালেও কয়েকটি পাড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২২ জনের রেংমিটচা ভাষাভাষীর লোকজন পাওয়া যায়। বর্তমানে ২০২১ সালে এসে আট বছরের ব্যবধানে সে সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ছয় জন। বাকীরা ইতোমধ্যে মারা গেছেন।”

”এছাড়া বর্তমানে জীবিত ছয় জনের সবাই একই পাড়ায় থাকে না। দুই উপজেলায় চার পাড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তারা। এর আগে রেংমিটচা নামে একটি গোত্র থাকলেও তাদের ভাষা আলাদা ও সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের আমাদের জানা ছিল না।”

”তবে রেংমিটচা ভাষাভাষীর লোকজন ম্রোদের সঙ্গে মূল স্রোতে মিশে যাওয়ায় তাদের সবাই এখন ম্রো ভাষায় কথা বলে। ছয় জন ছাড়া এ ভাষা আর কেউ জানে না। ছেলেমেয়ে কেউ হয়ত বুঝতে পারবে। কিন্তু জবাব দিতে জানবে না।আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নে তৈন খাল।

ইয়াংঙান ম্রো বলেন, রেংমটিচা ও ম্রো ভাষার মধ্যে মাত্র দশ ভাগ মিল আছে। এর নব্বই ভাগ একেবারে অমিল। তারা যখন কথা বলে ম্রোরা কেউ বুঝতে পারে না। ম্রোদের সাথে মিশে যাওয়ায় তাদের সবাই ম্রো ভাষা বলতে পারে।

সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পক্ষ থেকে আলীকদম উপজেলায় একটি রেংমিটচা পাড়ায় যাওয়া হয়। উপজেলার সদর ইউনিয়নে একটি দুর্গম এলাকায় এই পাড়ার নাম ক্রাংসি পাড়া। এর অবস্থান উপজেলা সদর থেকে তৈন খাল হয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার মত পায়ে হাঁটার পথ। 

ওই পাড়ার প্রধান কারবারী তিনওয়াই ম্রোর সাথে প্রতিনিধির কথা হয়। তিনি জানান, এ পাড়ার বয়স আনুমানিক ৩০০ বছরের বেশি হবে। একসময় পাড়ার সবাই রেংমিটচা পরিবার ছিল। পরে অনেকে বার্মা ও ভারতে চলে যায়। কেউ আলীকদমের অন্য জায়গায় চলে যায়। কেউ কেউ মারা গেছে। এসব কারণে রেংমিটচা ভাষাভাষীর মানুষ কমে যায়।

বর্তমানে এই পাড়ায় ২২টি পরিবারের মধ্যে ৭টি রেংমিটচা পরিবার রয়েছে। তবে এ পাড়ায় মাত্র তিন জন ছাড়া অন্যদের কেউ এ ভাষায় কথা বলতে জানে না বলে জানান তিনি।

এ পাড়ার বাসিন্দা সিংরা ম্রো বলেন, তিনি রেংমিটচা ভাষা পরিবারে একজন সদস্য। কিন্তু এ ভাষায় কথা বলতে জানেন না। সহজ কিছু কথা বুঝতে পারেন মাত্র। তবে তার বাবা মাংপুং ম্রো রেংমিটচা ভাষা এখনও ভালো করে বলতে পারেন বলে জানান তিনি।

পরে রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতে পারে এমন ছয় জনের তালিকা দেন তিনি।

তারা হলেন এই ক্রাংসি পাড়ার বাসিন্দা ও তার বাবা মাংপুং ম্রো (৬৭), কোনরাও ম্রো (৭০) ও কোনরাও ম্রো (৬০)। এছাড়া নোয়াপাড়া ইউনিয়নে মেনসিং পাড়ার বাসিন্দা থোয়াই লক ম্রো (৫৫) এবং বাকী দুজন হলেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ওয়াইবট পাড়ার বাসিন্দা রেংপুং ম্রো (৬৫) ও সাংপ্ল পাড়ার বাসিন্দা মাংওয়াই ম্রো (৬৩)।

এদের মধ্যে কোনরাও ম্রো নামে দুজন নারী এবং বাকী চার জন সবাই পুরুষ। একজন বাদে অন্য সবার বয়স ষাটোর্ধ্ব।তৈন মৌজার এলাকায় ক্রাংসি পাড়া।

ক্রাংসি পাড়ার বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সী রেংমিটচা ভাষী মাংপুং ম্রো জানান, তিনি ১০-১২ বছর থাকতে ৫টি রেংমিটচা পাড়া ছিল। তখন একেকটি পাড়ায় ৫০-৬০ পরিবার ছিল। বাইরে থেকে কেউ পাড়ায় আসলে ওই সময় রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতে হত।

”এরপরে আমদের কেউ কেউ বার্মায়, কেউ ভারতে চলে যায়। বাকীরা ম্রো জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়। এভাবে দিন দিন আমাদের সংখ্যা কমতে থাকে।”

নিজের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার প্রসঙ্গে মাংপুং ম্রো জানান, রেংমিটচা ভাষায় কথা বললে তখন ম্রোদের অনেকেই হাসাহাসি করত। আমাদের ছেলেমেয়েরাও সঙ্কোচবোধ করত। রেংমিটচা ভাষায় আর কথা বলতে চাইত না। পরবর্তীতে এ ভাষায় কথা না বলতে বলতে সবাই নিজের ভাষা ভুলে যেতে শুরু করে।

এ ভাষায় কোন গান অথবা সঙ্গীত রয়েছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত এ ভাষায় কোন গান শুনিনি। দাদা-দাদীর কারও মুখে কোন গান গাইতেও দেখিনি। তবে ছন্দ মিলিয়ে কয়েকটি খেলাধুলার কথা শুনান তিনি।

এ পাড়ার বাসিন্দা আরেক রেংমিটচা ভাষী কোনরাও ম্রো (নারী) বলেন, তার দুই মেয়ে, এক ছেলে রয়েছে। তাদের কেউ রেংমিটচা ভাষা বলতে পারে না। এখন ঘরেও নিজের ভাষায় কথা বলার কেউ নেই। বাইরে ম্রো ভাষা বলতে বলতে রেংমিটচা ভাষা বলার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে না। নিজের ভাষায় কিছু বলতে চাইলেও এ ভাষায় জবাব দেওয়ার কেউ নেই। তার জন্য মাঝে মাঝে দু:খ হয়।

কোনো ধরনের পদক্ষেপ এবং ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ ভাষা বেঁচে থাকবে এমন প্রশ্নের জবাবে এই দুই রেংমিটভাষী ঝে মাঝে রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতে চাই আমরা। কিন্তু অপরজনের কাছ থেকে তো আমাদের ভাষায় উত্তর আসে না। তখন খুব খারাপ লাগে। একাকীত্ববোধ করি।

”কিন্তু নিজেদের ভাষায় কথা বলে বেঁচে থাকতে চাই আমরা। নতুন প্রজন্মরা এ ভাষায় আর কথা বলতে পারে না। জানেই না। এত কম ভাষার মানুষ নিয়ে কি পদক্ষেপ নিলে আমাদের রেংমিটচা ভাষা সংরক্ষিত হবে আমাদের জানা নেই।”

তবে রেংমিটচা ভাষাভাষীদের আলাদা জনগোষ্ঠী বলে মনে করেন ম্রোদের আরেক লেখক ও বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য সিংইয়ং ম্রো।

তিনি জানান, তাদের ভাষা ছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় সবকিছু ম্রোদের সাথে মিল রয়েছে। যার কারণে ম্রোদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মিশে গেছে। ফলে তারা নিজেদের ভাষা ভুলে গেছে। বলতে গেলে তারা এখন ম্রো হয়ে গেছে। 

”তারা এখন রেংমিটচা ভাষায় বলে না। ম্রো ভাষায় কথা কথা বলে। অনেক সময় নিজের ভাষা যেটুকু পারে সেটাও পর্যন্ত বলতে চায় না সঙ্কোচের কারণে।”রেংমিটচাভাষী মাংপুং ম্রোর ছেলে সিংরা ম্রো। কিন্তু তার প্রজন্ম রেংমিটচা ভাষা ভুলে গেছে।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে খুবই কম এমন একটি ভাষা সংরক্ষণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিংইয়ং ম্রো জানান, রেংমিটচা ভাষা যেহেতু একটি ভাষা। এ ভাষা সংরক্ষণের ব্যাপারে আগে কয়েকবার মিটিং করা হয়েছে। তাদেরকেও ডেকেছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার তারা নিজেরাও এ ব্যাপারে আর আগ্রহী না। নিজের ভাষায় কথা বলতে উৎসাহ দিয়ে এবং তাদের রেংমিটচা পরিবার সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করলে কিছুটা সংরক্ষিত হবে এমন মত দেন তিনি।

এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে রেংমিটচা ভাষার গবেষক ও আমেরিকার ডার্টমাউথ কলেজের ভাষাতত্বের অধ্যাপক ডেভিড এ পিটারসন এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এক ইমেইল বার্তায় তিনি জানান, ম্রো জনগোষ্ঠী নিয়ে ৬০ এর দশকে প্রকাশিত জার্মানীর বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী লরেন্স লুফলার তার গবেষণা গ্রন্থ ‘দ্য ম্রো’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন আলীকদমের তৈন মৌজার এলাকায় রেংমিটচা নামে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। যাদের ভাষা আলাদা ও স্বতন্ত্র। কিন্তু তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ম্রোদের সাথে মিল রয়েছে।

”এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে বান্দরবানে খুমী, ম্রো ও রেংমিটচা ভাষা নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করি। অনেকে মনে করেছিল রেংমিটচা ম্রোদের একটি উপভাষা। কিন্তু গবেষণা করে দেখেছি- এটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও আলাদা একটি ভাষা। আলীকদমে গিয়ে রেংমিটচা ভাষাভাষীদের সাথে কাজ করেছি। র্দীঘদিন তাদের মিশে দেখেছি জীবন জীবিকা ও সামাজিক বিশ্বাস ম্রোদের কাছাকাছি। কিন্তু ভাষাগত দিক দিয়ে একেবারেই ভিন্ন।”

তবে রেংমিটচা ভাষা খুমী, ম্রো , লুসাই, বম, খিয়াং ও পাংখুয়া ভাষার মত তিব্বতি-কুকি চিন ভাষা পরিবারে অন্তর্ভূক্ত জানিয়ে ডেভিড জানান, মিয়ানমারে আরাকান ও চিন রাজ্যে এ ভাষা থাকতে পারে। কিন্তু গবেষণা করে আমি খুঁজে পাইনি। রেংমিটচা বাস্তবে বাংলাদেশেই পাওয়া গেছে।

এ ভাষা সংরক্ষণের ব্যাপারে অধ্যাপক ডেভিড বলেন, বিলুপ্তপ্রায় এ ভাষা সংরক্ষণের জন্য যতটুকু সম্ভব তাদের কথা রেকর্ডিং করে রাখা দরকার। এটা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার। এছাড়া নতুন প্রজন্ম এবং তাদের ছেলেমেয়েদের এ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। 

তারা বেঁচে থাকতে এটাই একমাত্র রেংমিটচা ভাষা সংরক্ষণের উপায় বলে মনে করেন তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT