দুঃখের শেষ নেই পাইকগাছার বাঁকা গ্রামের ১২ হাজার মানুষের - CTG Journal দুঃখের শেষ নেই পাইকগাছার বাঁকা গ্রামের ১২ হাজার মানুষের - CTG Journal

রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ১০:৫২ পূর্বাহ্ন

        English
দুঃখের শেষ নেই পাইকগাছার বাঁকা গ্রামের ১২ হাজার মানুষের

দুঃখের শেষ নেই পাইকগাছার বাঁকা গ্রামের ১২ হাজার মানুষের

ফসল ফলছে না ২ হাজার বিঘা জমিতে, কপোতাক্ষ নদ খননের দাবি গ্রামবাসীদেরগত বর্ষা মৌসুমে বিল বাঁকার চরের জলাবদ্ধ পানিতে রোপন করা বোরো ধান। পাশে জলাবদ্ধ পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘর।

‘কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় আমাদের ডুবে মরতি হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে আমরা সাত-আট মাস বাড়িতে থাকতি পারি নে। বাকি তিন-চার মাস থাকে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব। কপোতাক্ষ নদ খনন করলি আমাগের আর ডুবে মরতি হবে না। তখন আমাগের আর কোনো সমস্যাও থাকবে না।’ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি ইউনিয়নের বাঁকা গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ গৃহবধূ জুলেখা বেগম এভাবেই তার কষ্টের কথা তুলে ধরেন।

সত্তরোর্দ্ধ মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী মোড়ল আক্ষেপ করে বলেন, ‘কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বাঁকা গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি, মাঠঘাট সব পানিতে তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকার কারণে বছরের সাত-আটমাস ধরে জলাবদ্ধ অবস্থা থাকে। আমরা মাঠে ফসল ফলাতে পারি না। কারো কাছে হাত পাততে পারি না। জমি থাকতেও আমরা দিন দিন গরীব হয়ে যাচ্ছি।’

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়লি ইউনিয়নের একটি গ্রাম বাঁকা। এই গ্রামের উত্তর পাশে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার দরগাপুর ইউনিয়নের দরগাপুর, শ্রীধরপুর, হোসেনপুর ও খরিয়াহাটি গ্রাম। খুলনার পাইকগাছা আর সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলাকে বিভক্ত করেছে কপোতাক্ষ নদ। বাঁকা গ্রামে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। ভোটার সংখ্যাও চার হাজারের বেশি। এই গ্রামের পাশের বিলটির নাম ‘বাঁকার চর’। এই বিলে বছরে দুবার ধান পেয়ে গ্রামবাসী পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দেই বসবাস করতেন। তবে সমস্যা শুরু হয় ২০০৬ সালে বিলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায়। বিলের পানি নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গ্রামের বাড়িঘর সাত-আট মাস বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকে। ঘরের মধ্যে মাচা করে বসবাস করতে হয় মানুষকে। গ্রামবাসীর খাদ্য যোগানোসহ বেঁচে থাকার অবলম্বন ‘বাকার চর’ বিলটির প্রায় ২ হাজার বিঘা জমিও বর্ষার পানিতে ডুবে থাকে। ফলে একযুগের বেশি সময় ধরে এ বিলের ফসল থেকে বঞ্চিত বাঁকা গ্রামের প্রায় ৬০০ মানুষ।

এলাকাবাসী জানান, ২০০৬ সালে জলাবদ্ধতার আগে বছরে দুইবার ধান হতো। এরমধ্যে শ্রাবণ থেকে অগ্রহায়ণ মাসে হতো আমন ধান। আর পৌষ থেকে চৈত্র মাসে ফলত বোরো ধান। এছাড়া ঘেরে চাষ হতো বাগদা চিংড়ি। কিন্তু এখন তার কোনো কিছুই আর হয় না। এক যুগের বেশি সময় ধরে  জলাবদ্ধতা থাকার কারণে বাঁকা গ্রামের  চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ। বছরের বেশির ভাগ সময় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে এই গ্রামের মৃত মানুষকেও কবর দেওয়ায় কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামবাসীর অভিযোগ এই বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা মিলছে না।মৌসুমের শেষদিক বাঁকার চরের জলাবদ্ধ পানিতেই বোরো ধান রোপণ করছেন কৃষকরা।

বাঁকা গ্রামের কৃষক জবেদ আলী বলেন, “ছয় মাসের বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতার কারণে আমরা জমি চাষ করতে পারিনে। একবিঘা জলাবদ্ধ জমি সেচ দিয়ে চাষ করতে ৬ হাজার টাকা বেশি লোকসান হয়। সব মানুষের বোরো ধান রোপন অনেক আগেই হয়ে গেছে। এখন শেষ মুহূর্তে আমরা সেই ধান রোপন করছি। দুঃখের কথা কি কবো-জলাবদ্ধতার কারণে আমরা অনেক সময় মৃত মানুষকে মাটি (কবর) দিতেও পারিনে।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ গাজী বলেন, পাশ্ববর্তী সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের শালিখা গ্রাম থেকে পাইকগাছা উপজেলার রাড়লি ইউনিয়নের বাঁকা হয়ে কাটাখালী পর্যন্ত কপোতাক্ষ নদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। এতে বাঁকা গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষকে বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে জলাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

রাড়লির ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ গোলদার বলেন, কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বাঁকা গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধ থাকে। অনেকের বাড়িঘর নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে বাঁকা গ্রামের বিলে কোনো ফসলও হয় না। এ গ্রামের মানুষ খুব কষ্টে জীবনযাপন করছে। বিষয়টি স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, পাউবোর কর্মকর্তা, বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যকে সরেজমিনে এনে দেখানোও হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পাউবো বাঁকা গ্রামে একটি খাল খননের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ৮০ লাখ টাকা খরচ হবে বলে সেটিও আর হয়নি। তবে কপোতাক্ষ নদ খনন হবে কিনা তা আমার জানা নেই।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহিদুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার শালিখা গ্রাম থেকে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার মধ্য দিয়ে কয়রা উপজেলার আমাদী পর্যন্ত কপোতাক্ষ নদের ৩০ কিলোমিটার এলাকা খনন করা হবে। এজন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তবে এখনো দরপত্র (টেন্ডার) আহবান করা হয়নি। দরপত্র আহবান করার পর আগামী বছরের শুরুতেই কপোতাক্ষ নদের খনন কাজ শুরু হবে। তখন আর জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকবে না।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, এই মুহূর্তে কপোতাক্ষ নদ খননের ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে কপোতাক্ষ নদ খননের ব্যাপারে ভালো কোনো সংবাদ পাবো।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, কপোতাক্ষ নদ খননের ব্যাপারে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছি। ইতিমধ্যে নদের কিছু কিছু জায়গা খননের ব্যাপারে টেন্ডারও হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের ভরাট অংশ খনন হয়ে গেলে আর জলাবদ্ধ সমস্যা থাকবে না। 

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT