তদারকির গাড়ি বিলাসিতায় খাদ্য মন্ত্রনালয় - CTG Journal তদারকির গাড়ি বিলাসিতায় খাদ্য মন্ত্রনালয় - CTG Journal

রবিবার, ০৭ মার্চ ২০২১, ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
এক রাতে মিললো ১২ কোটি টাকার ইয়াবা ‘ওয়াজ-মাহফিলের নামে জাতিকে ঈমানহারা করছেন তাহেরী’ মানিকছড়িতে দুগ্ধগাভী পেলেন অভিভাবকহীন শিশু-কিশোর পরিবার নিবন্ধন ৪৯ লাখ, টিকা নিয়েছেন ৩৬ লাখের বেশি মানুষ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে ভারত ‘খুশি’ এক বা দুই ডোজ যা-ই হোক, সহজলভ্য ভ্যাকসিন গ্রহণের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের ফেনীতে একটি ভবনে বিস্ফোরণে মা ও দুই মেয়ে দগ্ধ বেরোবি’র বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে: ইউজিসি রোজার আগেই ‘মাঠে নামবে’ গণফোরাম করোনাভাইরাস: দেশে আরও ১০ মৃত্যু, শনাক্ত ৫৪০ সংশোধন নয়, ২৬ মার্চের আগেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন: জাফরুল্লাহ চৌধুরী চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত আরও ৯২ জন
তদারকির গাড়ি বিলাসিতায় খাদ্য মন্ত্রনালয়

তদারকির গাড়ি বিলাসিতায় খাদ্য মন্ত্রনালয়

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে শরীয়তপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, গাড়ির অভাবে তিনি দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সমস্যা কিছুটা ভিন্ন। তিনি ৩৭ বছরের পুরোনো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হলে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে আপত্তি জানানো হচ্ছে।
শুধু এই দুই কর্মকর্তাই নন, গাড়ির অভাবে কাজ করতে পারছেন না খাদ্য অধিদপ্তরের ১৬টি জেলার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। অথচ সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করছেন খাদ্যমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম ও খাদ্যসচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন। মন্ত্রী-সচিবের একান্ত সচিবদের গাড়িও অধিদপ্তরের। এই তালিকায় আরও রয়েছেন উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিবেরাও। আর খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক দুই মহাপরিচালক মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান ও ফয়েজ আহমদ অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করছেন না। কিন্তু তাঁরা এখনো অধিদপ্তরের গাড়িচালক ব্যবহার করছেন। চালককে ব্যবহার করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মানবেন্দ্র ভৌমিকও। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই গাড়ির অভাবে ধান–চাল সংগ্রহ, খোলাবাজারে খাদ্য বিক্রি কর্মসূচি (ওএমএস), ১০ টাকা কেজি দরের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও খাদ্যগুদাম পরিদর্শন করতে পারছেন না। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তার গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার নেই, তাঁরাও গাড়ি ব্যবহার করছেন।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ব্যবহার করছেন খাদ্য অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো ঘ-১৪-২১৬০ নম্বরের স্পোর্টস কার। পরিবহন পুলের ঢাকা মেট্রো-ভ-১১-১৮২৯ নম্বরের সিডান কারও তিনি ব্যবহার করেন। খাদ্যসচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন ঢাকা মেট্রো ঘ-১৪-২১৪৬ নম্বরের প্রাডো, খাদ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ঢাকা মেট্রো ঘ-১৪-১৮৯৩ নম্বরের জিপ ব্যবহার করছেন। খাদ্যমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ঢাকা মেট্রো ঘ-১৪-২০৬৯ নম্বরের জিপ, খাদ্যসচিবের একান্ত সচিব ঢাকা মেট্রো ঘ-১৪-১৮৬৩ নম্বরের জিপ ব্যবহার করছেন। আর খাদ্যমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) ব্যবহার করছেন মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো চ-৫১-১৫৬২)।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন ২০০৭ সালের ১ মার্চ থেকে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পদ। একপর্যায়ে সচিবও হন তিনি। দায়িত্ব পান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হয়েছিলেন। এরপর প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান হন। এত বড় বড় পদে থাকার সময়ও তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়িচালককে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি চালাতে ব্যবহার করছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবুল কালাম হাওলাদার এখনো মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানের ব্যক্তিগত গাড়ি চালান। এ বিষয়ে মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবুল কালাম হাওলাদার মাঝেমধ্যে আমার গাড়ি চালায়। গ্রামের বাড়ি গেলে তাকে নিয়ে যাই। দীর্ঘদিন সে আমার সঙ্গে ছিল। বিশ্বস্ত হিসেবে সে আমার সঙ্গে যায়।’
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ থেকে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট অবসরে যাওয়া সরকারের অতিরিক্ত সচিব ফয়েজ আহমদ এখনো অধিদপ্তরের গাড়িচালক দিয়ে তাঁর নিজের গাড়ি চালাচ্ছেন। একই কায়দায় চালকদের ব্যবহারের তালিকায় রয়েছেন অবসরে যাওয়া খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মানবেন্দ্র ভৌমিক, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহসেনা খানম, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব এ জেড এম এরশাদ আহসান হাবীব।
জানতে চাইলে সাবেক খাদ্যসচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের গাড়ি মাঠপর্যায়েই ব্যবহার করা উচিত। আর যেসব কর্মকর্তা অবসরে চলে গেছেন তাঁদের অধিদপ্তরের কোনো সেবা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী মন্ত্রীরা গাড়ি-সুবিধা পান। ২০১৬ সালে আইনটি সর্বশেষ সংশোধন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী, মন্ত্রীরা পরিবহন পুলের একটি কার ব্যবহার করবেন। সরকারি কাজে ঢাকার বাইরে গেলে মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তর মন্ত্রীকে একটি জিপ সরবরাহ করবে। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী রাজধানীতেই জিপ ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে পরিবহন পুলের সিডান কারও তিনি ব্যবহার করেন।
 খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গাড়ির অভাবে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি তদারক করতে পারছেন না
 তাঁদের গাড়ি ব্যবহার করছেন খাদ্যমন্ত্রী, খাদ্যসচিব, মন্ত্রী–সচিবদের পিএসসহ আরও অনেকে
এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের গাড়ি না থাকায় অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করা হয়। এটা অনেকেই করেন। এমন কোনো মন্ত্রণালয় পাওয়া যাবে না যেখানে অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে না।’ তবে এতে অধিদপ্তরের দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে কি না তা নিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন মন্ত্রী।

ছয়টি উপজেলা নিয়ে শরীয়তপুর জেলা। জেলা সদর থেকে প্রতিটি উপজেলার দূরত্ব ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে অফিস সময়ের পরও বিভিন্ন খাদ্যগুদামে যেতে হয়। তিনি গাড়ির অভাবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ অন্যান্য কর্মসূচি নিবিড়ভাবে তদারক করতে পারেন না। একই চিত্র পাওয়া গেছে মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, নড়াইল, বরগুনা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ফেনী জেলায়ও।
খাদ্য অধিদপ্তরে চালকের তুলনায় গাড়ি কম থাকায় তাঁদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তিদের বাসার গাড়ি চালানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এসব চালক ব্যক্তিমালিকানার গাড়ি চালাতে রাজি নন। কিন্তু অফিসের সিদ্ধান্তের কারণে তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
একজন গাড়িচালক জানিয়েছেন, খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নিজেদের সুবিধা পাওয়ার জন্য এভাবে অধিদপ্তরের গাড়ির চালকদের ব্যবহার করছেন। খাদ্য অধিদপ্তরে দিনের পর দিন এভাবে অনিয়ম চলে আসছে। অধিদপ্তরের গাড়ি নিজেদের বিলাসিতায় ব্যবহার করছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। অথচ জ্বালানি যাচ্ছে অধিদপ্তরেরই।
গাড়ির তুলনায় চালকের সংখ্যা বেশি কেন, জানতে চাইলে অধিদপ্তরের একজন পরিচালক বলেন, অনেক সময় গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। নতুন গাড়ি কেনা না হলে সংশ্লিষ্ট গাড়িচালকের কোনো কাজ থাকে না।
গাড়ির অভাব সরকারের নানা কর্মসূচিতেও প্রভাব ফেলেছে। যেমন এ বছর হাওরে অকালবন্যা, ২০ জেলার ভারী বন্যা এবং ব্লাস্ট রোগের কারণে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চালের দাম বাড়তে থাকে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেখোলাবাজারে চালসহ সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছে। কিন্তু গাড়ির অভাবে এসব কর্মসূচি তদারক ব্যাহত হচ্ছে। কুমিল্লা খাদ্যগুদামের চাল বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, গাড়ি না থাকার কারণে তাঁদের পক্ষে প্রতিদিন তদারক করা সম্ভব হয়নি।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান একাধিকবার অধিদপ্তরের গাড়ি, বিশেষ করে যাঁরা গাড়ির প্রাধিকারপ্রাপ্ত নন তাঁদের গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু মহাপরিচালকের কথায় সায় দেননি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। গাড়ির বরাদ্দের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে বদরুল হাসান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT