জাতীয় রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ - CTG Journal জাতীয় রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ - CTG Journal

বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
কাদের মির্জার ভাই ও ছেলেসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব: আরও ৭ গ্রেফতার সমঝোতা নয় হেফাজতকে শক্তভাবে দমনের দাবি লকডাউনে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ চলবে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট লোহাগাড়ায় একদিনেই ৩৩ জনকে জরিমানা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে নুরের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবেদন ৬ জুন সালথা তাণ্ডব: সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার বাঁশখালীতে ‘শ্রমিকরাই শ্রমিকদের গুলি করে হত্যা করেছে’! প্রাথমিক শিক্ষকদের আইডি কার্ড দেওয়ার আশ্বাস ‘নারী চিকিৎসকের প্রতি পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখা যায়নি’ চুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ২৪ এপ্রিল মিকনকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে: কাদের মির্জা
জাতীয় রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

জাতীয় রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

♦ আবুল কাসেম ফজলুল হক-

১৯৯১ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসগুলোর লোকদের কাছে ধরনা দিতে যান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কেও তাঁরা চলে যান। বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং এনজিও-কর্তারা ও সিএসও-কর্তারা সেই আশির দশক থেকেই ক্রমাগত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও তত্পরতা প্রদর্শন করছেন এবং সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। এই সময়ে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় কূটনীতিকরাও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয় থেকেছেন। ভালো ভালো কথা তাঁরা ক্রমাগত বলছেন; কিন্তু ভালো কথার ফল খারাপ, ভালো হতে দেখা যায়নি।

ভারতও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয়। ভারতবিরোধী কোনো শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসুক—এটা ভারত চায় না। এই সময়ে বাংলাদেশে এক নির্বাচনের চিন্তা ছাড়া রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয়েই চিন্তা নেই। এক পক্ষ থেকে বলা হয় যে বাংলাদেশের সংবিধান দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ। অন্য নানা পক্ষ থেকে নানাভাবে বলা হয় যে এই সংবিধান নিকৃষ্ট—এ নিয়ে বাংলাদেশে আইনের শাসন সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত সংবিধানের ১৬টি সংশোধন হয়েছে। এই সংশোধনগুলো সংবিধানের মূল স্পিরিটকে অবলম্বন করে করা হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনে বাস্তবসম্মত অগ্রসর কোনো চিন্তা নেই। স্বার্থান্বেষী নানা মহল নিজেদের স্বার্থ দেখছে; এর মধ্যে জাতীয় স্বার্থ, জনস্বার্থ, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ দেখার মতো কোনো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বামপন্থীদের কার্যকলাপ, শক্তি ও সম্ভাবনা আশাপ্রদ নয়। বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার চেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্রিটিশ সরকার তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে এবং ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেলের সার্টিফিকেট দিচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার চালাচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমের ইংলিশ ভার্সন। বাংলা মাধ্যমের মূলধারার শিক্ষাকে ভেতর থেকে বিনষ্ট করে রাখা হচ্ছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে অদ্ভুত রকমের পাবলিক পরীক্ষা চালু করে শিশুকাল থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানবিমুখ ও পরীক্ষামুখী করে তোলা হচ্ছে। সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির নামে ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত বিরক্তিকর এক শিক্ষাবৈরী, জ্ঞানবৈরী পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়েছে। কোচিং সেন্টার ও গাইড বুকের স্বর্ণযুগ কায়েম করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকেই রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা বহুধাবিভক্ত করে রাখা হয়েছে। ঋণখেলাপিরা দিন দিন শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি ব্যাংকগুলোর টাকা আত্মসাতের ধারা অত্যন্ত বেগবান হয়েছে। নানাভাবে টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলোও দুর্নীতিতে এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজে মত্ত আছে। সরকারি অফিসে ন্যায়নীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত আছে দুর্নীতি। ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, আস্তিকতা ও নাস্তিকতা নিয়ে চলছে সংঘাত-সংঘর্ষ। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বলছে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, অন্ধকারের শক্তি। এর প্রতিক্রিয়ায় অন্য পক্ষ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের বলছে নাস্তিক, ইসলামবিরোধী, মুরতাদ।

মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ন্যাটোর সামরিক অভিযানের ও যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস প্রভৃতি জঙ্গিবাদী শক্তি এবং সেসবের শাখা-প্রশাখা বাংলাদেশেও বিস্তৃত হয়েছে। এতে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সমাজের স্তরে স্তরে বিরাজ করছে হিংসা-প্রতিহিংসা। জাতিকে এমনভাবে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে যে জাতীয় চেতনার জায়গায় সৃষ্টি করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক চেতনা—এক সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি এবং অন্য সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষশক্তি। সরকার চেষ্টা করেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। জাতীয় সংসদে এবং বাইরে কোনো বিরোধী দল নেই। সরকারের ও সরকারি দলের লোকদের ক্ষমতা ও শক্তি অপরিসীম। কিন্তু সুনীতি ও ঐক্যের অভাবে সরকার ও সরকারি দলকেও সংকটের মধ্যে আছে বলে মনে হয়। সমাজের স্তরে স্তরে চলছে সীমাহীন জুলুম-জবরদস্তি।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ উন্নতি করছে। জাতীয় সম্পদ ও ধনিক শ্রেণির লোকদের সম্পত্তি অনেক অনেক বেড়েছে। গোটা দুনিয়াতেই উত্পাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির জোয়ার চলছে। এ অবস্থা ৪০ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে উত্পাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির কিছু বিশেষ সুযোগ অন্তত তিন দশক ধরে ধীরে ধীরে বেড়েছে। প্রযুক্তির ও শ্রমশক্তির কল্যাণে উত্পাদন ও সম্পদ বেড়েছে এবং বাড়ছে। কিন্তু এই উত্পাদন বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ ভালো চলছে না।

পশ্চিমের দেশগুলোও এখন আর সভ্যতার ও প্রগতির ধারায় নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই প্রাচুর্য ও সম্পদ নিয়েও ইউরোপ-আমেরিকা সভ্যতার সংকটে পড়ে যায়। এর মধ্যে মার্ক্সবাদ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন আত্মপ্রকাশ করেছিল। রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব মানবজাতির মধ্যে নতুন আশা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে গেলে ক্রমে ক্রমে চীনও গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে। এর ফলে সমাজতন্ত্র নিয়ে আর আশাবাদ নেই। এর মধ্যে সমাজতন্ত্রকে আদর্শরূপে রক্ষা না করে ধনিক-বণিক ও সাম্রাজ্যবাদীদের নির্বাচনতন্ত্রে পর্যবসিত করা হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে রূপ ও প্রকৃতি দেখা যাচ্ছে, তাতে গণতন্ত্রের প্রতিও মানুষের আর আস্থা নেই। আদর্শগত এই শূন্যতার মধ্যে পুরনো পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাসের ও ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী কায়েমি স্বার্থবাদীরা এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় থাকার আয়োজন করেছে। জনজীবনের সমস্যাবলি সমাধানের এবং পর্যায়ক্রমে অন্যায় কমানোর ও ন্যায় বৃদ্ধির চেষ্টা কোনো রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে না।

এই অবস্থায় দুনিয়াব্যাপী প্রতিটি জাতিকে সর্বজনীন গণতন্ত্র উদ্ভাবন করে পর্যায়ক্রমে ন্যায় বাড়ানোর ও অন্যায় কমানোর লক্ষ্যে প্রগতিশীল নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে সব রাষ্ট্র মিলে নতুন আন্ত রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাতিসংঘ দিয়ে কিছু আশা করা যায় না। বিশ্বায়নের নামে জি-সেভেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ যা চালাচ্ছে, তা সাম্রাজ্যবাদেরই নামান্তর। বিশ্বায়ন বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদেরই উচ্চতর স্তর। জাতীয়তাবাদ ও এর সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ অবলম্বন করে নতুন আন্ত রাষ্ট্রিক কর্তৃপক্ষ বা বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশে এবং পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে এসব বিষয় নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা দরকার। প্রকৃতপক্ষে ন্যাটো, জি-সেভেন, বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বে পরিচালিত বিশ্বায়নের মধ্য দিয়ে মানবজাতি আজ সভ্যতা ও প্রগতির ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে বর্বরতার ধারায় চলছে। সভ্যতা ও প্রগতির ধারা প্রতিষ্ঠা করা হলে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সব মানুষ আজ খেয়ে-পরে নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকারী হতে পারে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৭ বছর ধরে গণমানুষ যে জীবন যাপন করছে এবং জাতীয় রাজনীতির যে অবস্থা দেখছে, তাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা হতাশ। খাওয়া-পরা ও ধন-সম্পদ অর্জনের আর বিদেশে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণের, অন্তত ছেলে-মেয়েদের বিদেশে নাগরিক করার বাইরে মানুষের আর বিশেষ কোনো আশা নেই। আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির অবস্থা উন্নত হবে—এমন আশা জনগণের মধ্যে নেই। এ অবস্থায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কামনা করি। সেই সঙ্গে আশা করি, ওপরে যে বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করলাম সেগুলো নিয়ে গুরুতর আলোচনা সম্ভব। সংকট সাময়িক; কিন্তু সংকট কাটানোর চিন্তা ও চেষ্টা নেই বলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। সংকটের অবসান ঘটানোর জন্য চিন্তা ও চেষ্টা চাই।

লেখক : চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT