ওই দেখা যায় নির্বাচন, কই আমাদের প্রশাসন? - CTG Journal ওই দেখা যায় নির্বাচন, কই আমাদের প্রশাসন? - CTG Journal

সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে আরও দুই ডজন হেফাজত নেতা আবারও চিকিৎসক দম্পতিকে জরিমানা ভার্চুয়াল কোর্টে জামিন পেয়ে কারামুক্ত ৯ হাজার আসামি লকডাউনের পঞ্চম দিনে ১০ ম্যাজিস্ট্রেটের ২৪ মামলা ওমানের সড়কে প্রাণ গেলো তিন প্রবাসীর, তারা রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা একই কেন্দ্রে টিকা না নিলে সার্টিফিকেট মিলবে না মামুনুলের বিরুদ্ধে অর্ধশত মামলা, সহসাই মিলছে না মুক্তি ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট পেতে সৌদি প্রবাসীদের বিশৃঙ্খলা সেরে ওঠা কোভিড রোগীদের জন্য কি ভ্যাকসিনের এক ডোজই যথেষ্ট? মানিকছড়িতে ভিজিডি’র চাল বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ নিরাপদ কৌশল লকডাউন: স্বাস্থ্য অধিদফতর ৩৬ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেবেন প্রধানমন্ত্রী
ওই দেখা যায় নির্বাচন, কই আমাদের প্রশাসন?

ওই দেখা যায় নির্বাচন, কই আমাদের প্রশাসন?

♦ মোফাজ্জল করিম-

প্রশ্নটা কি একটু বেশি আগে করা হয়ে গেল? কেউ হয়তো বলতে পারেন, নির্বাচন সে তো হনুজ দূর-অস্ত্ না হলেও আরো অন্তত ৮-৯ মাস বাকি, এখনই প্রশাসনের খোঁজ পড়ল কেন? আগে নির্বাচনী তফসিল-টফসিল তো ঘোষণা করা হোক, সংবিধান মোতাবেক প্রশাসনকে ন্যস্ত করা হোক নির্বাচন কমিশনের আওতায়, তারপর জানা যাবে প্রশাসনের হালহকিকত কেমন আছে। অঙ্কের হিসাবে কথাটা হয়তো ঠিক, কিন্তু আমরা তো আবার ঘরপোড়া গরু, আমরা সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই কিনা। লোকে বলে, আমাদের নাকি সব কিছুতেই ‘ঘুমাইয়া কাযা করেছি ফযর, তখনো জাগিনি যখন যোহর’ অবস্থা। অতএব, আগেভাগেই একটা ‘ওয়েক-আপ কল’ দিয়ে রাখলে দোষ কী? না হয় কিছু কিছু কর্তাব্যক্তি ভুরু কোঁচকাবেন সুখনিদ্রার ব্যাঘাত ঘটায়, কেউ হয়তো কাঁই-কুঁই করবেন, তবু সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান—এই প্রবচনটি মনে রেখে কথাগুলো উগরে ফেলাই ভালো মনে করি।

প্রকৃতিতে যেমন, রাজনৈতিক অঙ্গনেও তেমনি চৈতালি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। খবরের কাগজ আর টিভি খুললেই দেখা যায় মাঠ গরম করা বক্তৃতা-বিবৃতি, রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচনমুখী নানা তৎপরতা, ধরপাকড় ইত্যাদির উত্তাপ ছড়ানো খবর। সাধারণ মানুষ, যাঁরা রাজনীতি করেন না, তবে নিরাপদ দূরত্বে থেকে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি লক্ষ করতে ভালোবাসেন, তাঁরা টের পেতে শুরু করেছেন শিগগিরই কিছু একটা হতে যাচ্ছে। তাঁদের স্মৃতিতে ১৯৯৬ বা ২০১৩-১৪ এখনো জ্বলজ্বল করছে। রাজনৈতিক ময়দানে যেকোনো অস্থিরতা তাঁদের কাছে সিঁদুরে মেঘের মতো। সরকার বা বিরোধী দল কোনো অসহিষ্ণু আচরণ করলে তাঁরা সংগত কারণেই শঙ্কিত বোধ করেন। জাতীয় নির্বাচনের যেখানে আর মাত্র ৮-৯ মাস বাকি, সেখানে উসকানিমূলক বক্তব্য বা আচরণ, আক্রমণাত্মক তৎপরতা—সেটা সরকার-বেসরকার যেকোনো পক্ষ থেকেই হোক না কেন—মোটেই কাম্য নয়। এতে করে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটবে, যার ফলে দেশবাসীর বহু আকাঙ্ক্ষিত একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণ স্বপ্নের নির্বাচন স্বপ্নই থেকে যাবে।

নির্বাচন নিয়ে যত আলোচনা, যত বিতর্ক, তার প্রথমেই প্রশ্ন আসে—নির্বাচনে কার বা কাদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত? ইংরেজিতে যাদের বলা হয় ‘স্টেকহোল্ডার,’ তারা কারা? নিঃসন্দেহে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলোর নাম এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে। তাঁরা বিস্তর লোক-লস্কর, টাকা-পয়সা নিয়ে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ‘ভোটযুদ্ধে’ অবতীর্ণ হন জয়লাভের উদ্দেশ্যে। অতএব, তাঁরা তো অবশ্যই ‘স্টেকহোল্ডার’ নাম্বার ওয়ান। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে দেশের আপামর জনসাধারণও ‘স্টেকহোল্ডার’। তাঁরা চান তাঁদের পছন্দের প্রার্থী বা দল ভোটযুদ্ধে জয়লাভ করুক। অতএব, দর্শক হিসেবে গ্যালারিতে বসে থেকে কিংবা হৈচৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি করে তারাও ‘স্টেকহোল্ডার’। এটাই স্বাভাবিক। আর এও স্বাভাবিক, যেখানে ভোট সেখানেই যুদ্ধ। সেখানেই ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো সূচ্যগ্র মেদিনী’। এই ‘যুদ্ধই’ হচ্ছে নির্বাচন নামক খেলার মজা।

তবে সব খেলাতেই যেমন সব অংশগ্রহণকারীর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলার কিছু নিয়ম-কানুন আছে, ভোটের খেলায়ও তেমনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ওপর প্রযোজ্য নিয়ম-কানুন আছে। এগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত এবং এতে ছাড় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। খেলার মাঠে যেমন খেলা পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে থাকেন রেফারি বা আম্পায়ার, তাঁকে সহায়তা করার জন্য থাকেন লাইন্সম্যান, থার্ড আম্পায়ার ইত্যাদি; তেমনি নির্বাচনের খেলার সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রেফারি হচ্ছেন নির্বাচন কমিশন। আর নির্বাচন কমিশনকে সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য সহায়তা প্রদান করতে সংবিধানই নির্দেশ দিয়েছে সরকার ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে। আরো খোলাখুলিভাবে বলা যায়, নির্বাচন কমিশন নামক যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রে—অর্থাৎ রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত, সারা দেশের আনাচে-কানাচে সেই প্রতিষ্ঠান তার ওপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে সরকারের সুবিস্তৃত নির্বাহী কর্তৃপক্ষ—অর্থাৎ প্রশাসনযন্ত্রের সহায়তায়। এটা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনু. ১২৬)।

এখানেই আসে সরকারি প্রশাসনের নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি। সাধারণভাবে আমরা প্রশাসন বলতে জনপ্রশাসনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা, বিশেষভাবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ক্যাডার ও পুলিশ সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বুঝে থাকি। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে এবং মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। আমাদের শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার যেসব প্রশাসনিক ইউনিটের মাধ্যমে দেশ শাসন করে, সেগুলো হচ্ছে—বিভাগ, জেলা ও উপজেলা। এই ইউনিটগুলোতে কর্মরত প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সব ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সংসদ নির্বাচনের সময় জেলা, উপজেলা ও বিভাগের মুখ্য আধিকারিক—যথাক্রমে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার—নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। একটি নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনসংক্রান্ত সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ রিটার্নিং অফিসার। সচরাচর প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকই নিজ জেলায় এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাঁকে সহায়তা করেন জেলা সদর ও উপজেলায় কর্মরত তাঁর সহকর্মীরা এবং অন্য সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এঁদের সবাইকে নিয়ে জেলা প্রশাসক—অর্থাৎ রিটার্নিং অফিসারের বিশাল টিম, যে টিমের দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের সাফল্য।

নির্বাচনসংক্রান্ত সব বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার সরাসরি নির্দেশ লাভ করেন নির্বাচন কমিশন থেকে। আবার একই সঙ্গে তাঁর নিজস্ব ‘চেইন অব কমান্ড’ মোতাবেক তাঁর সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ক্যাবিনেট ডিভিশন কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশ-নির্দেশ-উপদেশও তাঁকে পালন করতে হয়। এমতাবস্থায় কখনো পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা জারি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। হয়তো দেখা গেল, এমন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যেখানে নির্বাচন কমিশন তাদের বিধিবিধানের আলোকে এক ধরনের ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং অফিসারকে টেলিফোনে নির্দেশ দিল। আবার পরক্ষণেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে টেলিফোনে একটি বিপরীতধর্মী নির্দেশ দিয়ে বসল। এক কর্তৃপক্ষ হয়তো বলল, ওই গোলযোগ সৃষ্টিকারীকে এক্ষুনি গ্রেপ্তার করুন। অন্য পক্ষ বলল, না, তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তখন? তখন রিটার্নিং অফিসার অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। সরকারি চাকরিতে অবশ্য এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি কখনো কখনো হয় এবং কথাবার্তা বলাবলি, চিঠি চালাচালির ভেতর দিয়ে সেসবের সমাধানও হয়। কিন্তু ভোটাভুটির সময় সেই সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাত্ক্ষণিকভাবে।

তখনই প্রয়োজন হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ধীশক্তি, ন্যায়পরায়ণতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার। তাঁর সিদ্ধান্তে কোন কর্তৃপক্ষ খুশি হলেন আর কে বেজার হলেন, তা গণনায় না নিয়ে আইন-কানুন, বিধি-বিধান মতো নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করলে অন্তত নিজের জেলায় একটি সুন্দর, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারবেন সেই রিটার্নিং অফিসার। তবে এমন ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত তখনই দেওয়া সম্ভব, যখন কর্মকর্তাটি এটা করলে দ্রুত প্রমোশন হবে, ওটা করলে চলে যেতে হবে পানিশমেন্ট পোস্টিংয়ে, এই দলকে তো আমার দেখতেই হবে, ওই দলের লোককে ঢোকাতে হবে হাজতে—এই ধরনের চিন্তা-চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করেন। কারো কারো মধ্যে আরেকটি ধ্যান-ধারণাও কাজ করে। নির্বাচন কমিশন? এরা আর আছেন কদিন। নির্বাচন শেষ তো এদের খবরদারিও শেষ। আমার আসল ‘বস্’ তো অমুক। অতএব, তিনি বা তাঁরা যা বলবেন তা সঠিক-বেঠিক যা-ই হোক, আমাকে মানতেই হবে। তা হলেই নো চিন্তা ডু ফুর্তি। এমন মানসিকতার কর্মকর্তার কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়? তিনি তো ‘যেমনি নাচাও তেমনি নাচি’ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে ‘জো হুকুম জাহাঁপনাদের’ দলে নাম লিখিয়ে বসেই আছেন। এ ধরনের মেরুদণ্ডহীন প্রাণীরা আর যা-ই হন, নির্বাচন-যুদ্ধের সেনাপতি পদের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন না।

আমরা সবাই জানি, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের। তারা জাতীয় অনুষ্ঠানের জন্য ওয়াদাবদ্ধ। কিন্তু এই গুরুদায়িত্বটি অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্য নিয়ে একা পালন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সে জন্যই প্রশাসনিক সাহায্য-সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে। আর প্রশাসন মানেই সরকার। ফলে যদিও কেতাবে লেখা আছে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে; কিন্তু আসল কাজের কাজটি করে সরকারের প্রশাসনযন্ত্র। আর সে কাজ কোনো রিপোর্ট লেখালেখি নয় বা গবেষণাধর্মী কাজ নয়, সে কাজ দেশের হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে কোটি কোটি ভোটারের ভোটগ্রহণ। আর কাজটি এমন নয় যে একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে আদেশ দিলাম : যাও রণক্ষেত্রে গিয়ে শত্রু নিধন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ো, আর অমনি তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলসমূহ, তাদের প্রার্থীরা, নেতাকর্মীরা, এমনকি ভোটাররাও চলবে নিজেদের হিসাব-কিতাবমতো। একটা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করবে সবখানে—এটা ধরে নিয়েই করতে হবে নির্বাচন। আর সেখানে নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধানের চেয়েও যেটা অধিক জরুরি তা হচ্ছে, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা। সর্বোপরি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার নিরপেক্ষতা।

প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রশাসন কতটা দক্ষ, সৎ ও নিরপেক্ষ? এসব বিষয়ে সাধারণ্যে যেসব কথা শোনা যায় তা খুব একটা প্রীতিকর কিছু নয়। ‘পাবলিক পারসেপশন’ নিঃসন্দেহে নেতিবাচক। অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। কারণ, যেকোনো নির্বাচনে—সেটি কোনো স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনই হোক অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনই হোক—দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা যদি নিরপেক্ষ না হন, যদি তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত অনুরাগ-বিরাগ দ্বারা প্রভাবিত হয়, যদি তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হন, তবে সেই জেলায় বা সেই ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না। এরূপ কর্মকর্তা যেকোনো উপায়ে তাঁর পছন্দের প্রার্থী বা দলকে জেতানোর জন্য যা যা করতে হয় করবেন। এবং তা ক্বচিৎ প্রকাশ্যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুকৌশলে পর্দার অন্তরালে।

কথাটা শুনতে খুব খারাপ শোনাতে পারে, তবে এরূপ স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভেতর এই ব্যাধিটি উনিশ শ আশির দশক পর্যন্তও ছিল না। এটা হাল আমলের আমদানি। আর এখন তো এমন হয়েছে, রীতিমতো ডিএনএ টেস্ট করে দেখা হয় অমুক কোন দলের, কোন মজহাবের। শিওর না হয়ে তাকে কোনো বড় পদে বা গুরুদায়িত্বে দেওয়া যাবে না। এমনকি তার ন্যায্য পদোন্নতি থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হবে। বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তালিকা ঘেঁটে দেখলে এ রকম ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। কে কবে ২০ বছর আগে ছাত্রজীবনে কোন দল করত, সেটা গবেষণা করে বের করে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। গত এতটা বছর যে লোকটা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সততার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করল, তা সবই বিফলে গেল।

এই প্রবণতাটা কিন্তু খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, তখন কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা তখনকার রাজনীতির প্রখর রৌদ্রতাপদগ্ধ অঙ্গনে নিজেদের ভেজা খড় শুকাতে লেগে গেলেন। এরশাদের পতনের পর যখন দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন কোনো কোনো পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সব নিয়ম-নীতি ও ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে প্রথমে গোপনে ও পরবর্তী পর্যায়ে প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুললেন। প্রথমে বোঝা না গেলেও পরে পরিষ্কার হয়ে যায়, এঁদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারকে হটানোর রাজনৈতিক আন্দোলনে শরিক হয়ে এঁরা বাংলাদেশ সচিবালয়ের সন্নিকটে ‘জনতার মঞ্চ’ নামক একটি সরকারবিরোধী মঞ্চ স্থাপন করে অহোরাত্র সংকীর্তনের মতো বক্তৃতা-বিবৃতি-স্লোগান-সংগীত ইত্যাদির আয়োজন করেন। বহুকাল পেছনে ফেলে আসা ছাত্ররাজনীতির কায়দায় উদ্দীপ্ত হয়ে অনেক তরুণ কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস-আদালত বাদ দিয়ে ‘জনতার মঞ্চে’ যোগদান করেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এঁদের সমর্থিত রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে এবং তাঁদের নেতারা সবাই চাকরিক্ষেত্রে নানাভাবে পুরস্কৃত হন। এভাবেই প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে বিষবৃক্ষের বীজ রোপিত হলো। যে সিভিল সার্ভিসে নিরপেক্ষতা, নৈর্ব্যক্তিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা ছিল গৌরবময় ঐতিহ্য, সেই সার্ভিসেই শুরু হলো সুস্পষ্ট বিভাজন। এমনকি ঈশপের গল্পের মেষশাবকের মতো পিতা-পিতামহের ঠিকুজিও হয়ে গেল প্রাসঙ্গিক। তুমি কোনো দল করো না, ছাত্রজীবনেও কোনো দিন রাজনীতির ধারেকাছেও ছিলে না বুঝলাম, কিন্তু তোমার দাদা তো ছিলেন অমুক দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা। ব্যস্, এটুকুই যথেষ্ট। এ ধরনের ডিএনএ টেস্টের ফলে অনেক মেধাবী, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষীয় রোষানলে পড়ে ক্যারিয়ারে হঠাৎ করেই মুখ থুবড়ে পড়লেন, আর অনেক অযোগ্য ও অদক্ষ তেলবাজ কর্মকর্তা পদায়ন-পদোন্নতিতে যোগ্যতরদের ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন। নব্বইয়ের দশকে যে অনাচার শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা আর বন্ধ হয়নি; বরং তা এখন বৃদ্ধি পেয়ে সব প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গ্রাস করার উপক্রম হয়েছে।

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সব দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রমনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশে বিনীত আবেদন রাখতে চাই : দোহাই আপনাদের, জাতির এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন জাতি একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার স্বপ্ন দেখছে, তখন আর কোনো জনতার মঞ্চ বা ওই ধরনের নাটকের আয়োজন করবেন না। জাতীয় নির্বাচন একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ওটা রাজনীতিবিদদেরই করতে দিন। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে আপনি শুধু আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্বটুকুই পালন করবেন। জনগণের অর্থে প্রতিপালিত আপনার দায়িত্ব রাজনীতি করা নয়, জনগণকে আইন-কানুন, বিধি-বিধানের মধ্যে থেকে সেবা প্রদান করা। এটা না করে কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে ভবিষ্যতে মন্ত্রী-মিনিস্টার হওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখলে তা হবে দেশবাসীর সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। নিকট অতীতে এমনটি যাঁরা করেছেন, আখেরে কিন্তু তাঁদের পরিণতি খুব একটা ভালো হয়নি। দেরিতে হলেও তাঁদের কারো কারো মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে, জনগণ তাঁদের চিনতে পেরেছে।

নিরপেক্ষতা, নৈর্ব্যক্তিকতা জনপ্রশাসনের ‘হলমার্ক’, যা তার গুণগত মান নিশ্চিত করে তাকে ঔজ্জ্বল্য দিয়ে আসছে চিরকাল। এটিকে পুঁজি করে জাতি একটি ‘চির উন্নত মম শির’ মন্ত্রে উজ্জীবিত ঋজু মেরুদণ্ডের প্রশাসন দেখতে চায় আগামী নির্বাচনে। আমরা আশা করব, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত স্বাধীনতাকে চির সমুন্নত রাখতে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতিকে এ ব্যাপারে বিফল করবেন না। আগামী জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই তাঁদের জন্য হবে একটি ‘এসিড টেস্ট’, যাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁরা সগৌরবে উত্তীর্ণ হবেন।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT