এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘সোনার মানুষের’ বার্তা - CTG Journal এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘সোনার মানুষের’ বার্তা - CTG Journal

বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
কাদের মির্জার ভাই ও ছেলেসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব: আরও ৭ গ্রেফতার সমঝোতা নয় হেফাজতকে শক্তভাবে দমনের দাবি লকডাউনে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ চলবে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট লোহাগাড়ায় একদিনেই ৩৩ জনকে জরিমানা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে নুরের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবেদন ৬ জুন সালথা তাণ্ডব: সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার বাঁশখালীতে ‘শ্রমিকরাই শ্রমিকদের গুলি করে হত্যা করেছে’! প্রাথমিক শিক্ষকদের আইডি কার্ড দেওয়ার আশ্বাস ‘নারী চিকিৎসকের প্রতি পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখা যায়নি’ চুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ২৪ এপ্রিল মিকনকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে: কাদের মির্জা
এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘সোনার মানুষের’ বার্তা

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘সোনার মানুষের’ বার্তা

মানুষের প্রতি ভক্তি থাকলে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে নেওয়া যায়। অন্যের শ্রদ্ধা নিজের জন্য অধিকতর সম্মান বয়ে আনে বলেই লালন বলেছেন–‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সোনার মানুষ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ গড়াও সম্ভব নয়। তাই এবারের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ধরা হয়েছে লালনের অমর বাণী ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। এই বার্তা নিয়েই বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে জাতীয় বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক এবং চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে আমাদের কামনাটা কী, সেটিই আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার ব্যানারে লিখি। আমরা চেষ্টা করি আমাদের দেশের কোনও মহান ব্যক্তি, কোনও সাহিত্যিক বা কোনও দার্শনিকের একটা বাণী শোভাযাত্রায় ব্যবহার করার। গত বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন, এর আগের বছর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা এসেছে। সে তুলনায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে লালন তো একটা বিশাল ব্যাপার। আমরা চেষ্টা করে দেখলাম লালনের কোনও গুরুত্বপূর্ণ বাণী খুঁজে পাই কিনা, যা এ মুহূর্তে দেশ এবং মানুষের জন্য প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে আমাদের কাছে মনে হয়েছে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—এই বাণীটি ব্যবহার করা যায়। এটি এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গা। কারণ, পুরো পৃথিবীতে নানা ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে। সেই তুলনায় একই পরিমাণে মানবিক গুণাবলি বাড়ছে কিনা তা আমরা সেভাবে ভাবছি না। আমাদের যখন অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না, বঙ্গবন্ধু কিন্তু সেই সময় বলে গিয়েছিলেন–সোনার বাংলা যে গড়বো, সোনার মানুষ কোথায়? এই যে ভাবনাটি তিনি সে সময় তুলেছিলেন, আমরা কিন্তু এখনও সামনে সেই ভাবনাটাকে তুলে ধরতে পারিনি।’

চারুকলায় বেশ কিছুদিন ধরেই পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলছে। বাংলার লোকশিল্পকে নানা রঙে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত হয় নানা রকম মোটিফ। এসব মোটিফ তৈরি পেছনে উদ্দেশ্য একটাই, বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প যেন হারিয়ে না যায়।

চারুকলার শিক্ষার্থীরা এখন ব্যস্ত নানা শিল্পকর্ম নিয়ে। কেউ বানাচ্ছেন মাটির তৈরি অশুভ শক্তির প্রতীকী মুখোশ, কেউ কাগজ কেটে তৈরি করছেন পেঁচার প্রতিকৃতি, কেউ বানাচ্ছেন হাতি, ঘোড়া, আর কেউ রং করছেন তাতে। আবার কেউ কেউ চারুকলার খোলা জায়গায় কাঠের বৃহৎ প্রতিকৃতি তৈরির কাজ করছেন। কাঠের প্রতিকৃতিতে ফুটিয়ে তুলছেন মাছ ও বক, একজন নারী পায়রা ওড়াচ্ছেন, সাইকেলে কৃষক ও তার কোলে শিশু, জেলের মাছ ধরা, পানিতে মাথা ভাসিয়ে রাখা মহিষ ইত্যাদি। কাগজ দিয়ে হাতে ধরার এবং ঝুলানোর মতো বিভিন্ন প্রতিকৃতিও বানাচ্ছেন তারা।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজ করছেন চারুকলার ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজেদের তৈরি জিনিস বিক্রির অর্থ দিয়ে মঙ্গল শোভযাত্রায় ব্যবহৃত নানা জিনিস তৈরির খরচ জোগানো হয়ে থাকে। চারুকলা অনুষদের ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাজ শুরু হয়েছে ১৫ মার্চ থেকে। শিল্পী রফিকুন নবী ক্যানভাসে তুলির আঁচড় দিয়ে এবং শিল্পী মনিরুল ইসলাম রং-তুলি দিয়ে ছবি এঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।’ বিশাল আকৃতির প্রতিকৃতিগুলোতে সুখ এবং সমৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি। শিক্ষার্থীরা জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার এই কাজ তদারকি এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আহ্বায়ক কমিটি ছাড়াও আরও কয়েকটি কমিটি রয়েছে।

পহেলা বৈশাখের সকালে শিক্ষার্থীদের তৈরি করা বিভিন্ন প্রতিকৃতি, কাগজের মুখোশ, মাটির তৈরি অশুভ শক্তির প্রতীকী মুখোশ নিয়ে চারুকলার মূল ফটক থেকে শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। রূপসী বাংলা হোটেল মোড় হয়ে শাহবাগ ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে আবার চারুকলার গেটে এসে শেষ হবে এ শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা একেকটি বার্তা নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া এ মঙ্গল শোভাযাত্রাকে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর এ স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণ হলো, এই শোভাযাত্রা অশুভকে দূর করা, সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাঙালির ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিগত সব ধরনের বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়ও মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৩ সদস্যের একটি দল কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার ওপর ওয়ার্কশপ করাতে যায়। সেখানে বিভিন্ন মোটিফ তৈরির কৌশল, ধর্মনিরপেক্ষ জিনিসগুলো নিয়ে চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী সাইদুল হক জুইসসহ আরও দুজন সেখানে ওয়ার্কশপ করাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক নিসার হোসেন। তিনি বলেন, ‘চারুকলার সাবেক ডিন অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বারক আলভীর মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কমিটি আছে। তারই উদ্যোগে তিন সদস্যের দলটি কলকাতা গেছে। এটার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো কলকাতার মানুষও যেন নিজেরাই শোভাযাত্রার জিনিসগুলো তৈরি করতে পারে।’

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT