এনআইডি জালিয়াতি: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র - CTG Journal এনআইডি জালিয়াতি: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র - CTG Journal

রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

        English
এনআইডি জালিয়াতি: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র

এনআইডি জালিয়াতি: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র

ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে দেশের ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়েছে একটি প্রতারক চক্র। ঢাকা ব্যাংকের দুটি হোম লোন নিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য জানতে পেরেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের পাঁচ সদস্য ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হবে।

ঢাকা ব্যাংক থেকে নতুন ফ্ল্যাট কেনার বিপরীতে ৮৫ লাখ টাকা করে ঋণ নিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগে গত ৭ ডিসেম্বর ও ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর খিলগাঁও এবং পল্টন থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে ঢাকা ব্যাংক। মামলা দুটির তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম প্রতারকদের ধরতে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, এই চক্রটি পেশাদার প্রতারক চক্র। তারা ভুয়া এনআইডি, ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট তৈরি করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করতো।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে বিপ্লব জানায়, ভুয়া এনআইডি তৈরির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিম্নপদের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত। এছাড়া তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাজধানীর রামপুরা ও খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আরও পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো আল আমিন ওরফে জামিল শরীফ, খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুত, আব্দুল্লাহ আল শহীদ, রেজাউল ইসলাম ও শাহ জামান।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে তারা বেশ কয়েক বছর ধরে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করতো। ঢাকা ব্যাংকের দুটি ঘটনা ছাড়াও তারা ইতোমধ্যে যমুনা ব্যাংক থেকে তিনটি ঋণ, এনআরবিসি ব্যাংক থেকে একটি, ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে একটি, সিটি ব্যাংক থেকে একটি, পুরাতন ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে তিনটি, ওয়ান ব্যাংক থেকে দুটি, ফার্স্ট লিজিং থেকে পাঁচটি, পিপলস লিজিং থেকে তিনটি, প্রিমিয়ার লিজিং থেকে একটি ও ফনিক্স লিজিং থেকে একটি করে হোম লোন নিয়েছে। এসব লোনের পরিমাণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৬০ লাখ টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পরিমাণ। সেই হিসেবে তারা ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার হওয়া মোট ছয় প্রতারকের মধ্যে মূল হোতা হলো আল আমিন ওরফে জামিল শরীফ ও খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুত। তারা দুজনেই আগে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতো। ব্যাংক থেকে ভুয়া পরিচয় দিয়ে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করে তারা ভুয়া এনআইডি তৈরি করার জন্য আব্দুল্লাহর কাছে যায়। আব্দুল্লাহ আল শহীদ একটি নামসর্বস্ব অনলাইনের প্রধান সম্পাদক পরিচয়ের আড়ালে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার কাজ করতো। আল-আমিন ও বিদ্যুত কোনও ভুয়া এনআইডি তৈরির কাজ দিলে আব্দুল্লাহ তা বিপ্লবের কাছে দিতো। বিপ্লব আগারগাঁওয়ের যে ভবনে আগে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়েছিল সেখানকার নিরাপত্তারক্ষী ছিল। বিপ্লব ভুয়া এনআইডি তৈরির জন্য সার্ভারের কয়েকজন কর্মচারীকে দিতো। আর রেজাউল ইসলাম ও শাহ জামান এই চক্রটিকে জাল ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট তৈরিতে সহায়তা করতো।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, জালিয়াতি এই চক্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের চার কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুজনকে জাল-জালিয়াতি করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগ থেকে সম্প্রতি সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এই চারজনকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহীদুর রহমান রিপন জানান, গ্রেফতারকৃত আসামিদের ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছে পুরো চক্রটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে।

এক লাখ টাকায় ভুয়া এনআইডি

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারক দলের হোতা আল আমীন জানিয়েছে সে প্রতিটি ভুয়া এনআইডি তৈরি করার জন্য আব্দুল্লাহকে এক লাখ টাকা করে দিতো। আব্দুল্লাহ সপ্তাহ বা দশ দিনের মধ্যে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দিতো। এসব এনআইডির তথ্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সার্ভারে থাকতো।

জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল্লাহ জানায়, সে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ থেকে ৬০ ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দিয়েছে। আল আমীন ও বিদ্যুত ছাড়া আরও যারা তার কাছ থেকে ভুয়া এনআইডি নিয়েছে তাদের নামও বলেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন। আব্দুল্লাহ জানিয়েছে, সে এক লাখ টাকা নিয়ে কিছু টাকা নিজের কাছে রেখে দিয়ে বাকি টাকা বিপ্লবকে দিতো। বিপ্লব আবার কিছু টাকা নিজের কাছে রেখে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে এনআইডি অফিসের স্টাফদের দিতো।

গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগেও ডিবি পুলিশের একটি দল প্রতারক চক্রকে গ্রেফতারের পর ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দেয় এনআইডি বিভাগের কয়েকজন স্টাফকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করে। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে এনআইডি কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেছেন, সম্প্রতি এনআইডি বিভাগ থেকে তাদের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তারা ৪৪ জন কর্মচারীকে ভুয়া এনআইডি তৈরি ও অন্যান্য জালিয়াতি কাজে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বরখাস্ত করেছেন। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের কেউ কেউ বরখাস্তের তালিকায় রয়েছেন।

জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ কে এম হুমায়ুন কবীর বলেন, এরকম জালিয়াতি তো করতে পারার কথা নয়। তারপরও আমি নতুন এসেছি। আমার কাছে অফিসিয়ালি কোনও সংস্থা যদি বিষয়গুলো জানায়, আমরা তদন্ত করে অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT